১৭ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ৭ই জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

চট্টগ্রামে পাহাড় ধসের আশঙ্কা


নিউজ ডেস্ক | PhotoNewsBD

৮ জুলাই, ২০১৯, ১২:৫৫ অপরাহ্ণ

বর্ষা মৌসুমে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে চট্টগ্রামে পাহাড় ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি রয়েছে বান্দরবানে। ইতোমধ্যে নগরীর লালখান বাজারের পর খুলশী থানাধীন জালালাবাদ হাউজিং সংলগ্ন মধুশাহ পাহাড় থেকে ৩৪টি পরিবারকে উচ্ছেদ করেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। গতকাল রোববার এই অভিযান চালানো হয়। এদিকে গত শনিবার মধ্যরাত থেকে টানা ভারী বৃষ্টি হওয়ায় বান্দরবানে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। বান্দরবানের সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এভাবে টানা বৃষ্টি হলে পাহাড় ধসের পাশাপাশি যে কোনো সময় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে বলে মনে করছে প্রশাসন ও স্থানীয়রা। গতকাল সকালে পাহাড় ধসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিংও করেছে প্রশাসন। খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ রক্ষা ও নিয়ন্ত্রণে নগরীতে আটটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। নগরীর ৬টি সার্কেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ৬ জন সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার সমন্বয়ে এসব আশ্রয়কেন্দ্রের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে আশ্রয় নিতে আসা লোকজনের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানিও মজুদ রাখা হয়েছে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

কর্মকর্তারা জানান, নগরীর আকবর শাহ ও পাহাড়তলী এলাকার পাহাড়ের বাসিন্দাদের জন্য পাহাড়তলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কৈবল্যধাম, লেকসিটি, ফয়’স লেক এলাকার ১ ও ২ নম্বর ঝিল এলাকার জন্য ফিরোজা শাহ-ই ব্লক স্কুল, মধুশাহ পাহাড় ও পলিটেকনিক্যাল সংলগ্ন পাহাড়ের জন্য চট্টগ্রাম মডেল হাই স্কুল, জালালাবাদ হাউজিং সংলগ্ন পাহাড়ের জন্য জালালাবাদ বাজার সংলগ্ন শেড, লালখান বাজারের টাংকির পাহাড়ের জন্য আল হেরা ইসলামিয়া মাদ্রাসা, মিয়ার পাহাড়ের জন্য রৌফাবাদ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, মতিঝর্ণা পাহাড়ের জন্য লালখান বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পোড়া কলোনির বাসিন্দাদের জন্য ছৈয়দাবাদ স্কুলকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার (ভূমি) তৌহিদুর রহমান বলেন, জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নির্দেশে শনিবার বিকাল থেকে পাহাড়ের বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সহকারী কমিশনার এবং জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে এ কাজ শুরু হয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ শুকনা খাবার ও পানি মজুদ রাখা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, জরুরি ভিত্তিতে আশ্রয়কেন্দ্রে আসা লোকজনের মাঝে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ হচ্ছে।

ত্রাণসামগ্রীর প্রত্যেক প্যাকেটে পাঁচ কেজি চাল, এক কেজি ডাল, এক কেজি চিনি, এক কেজি চিড়া, এক প্যাকেট দিয়াশলাই ও এক প্যাকেট মোমবাতি রয়েছে বলে জানান তিনি।

বান্দরবান প্রতিনিধি সরেজমিন ঘুরে ও বিভিন্ন উপজেলায় খবর নিয়ে জানান, জেলা সদর, রোয়াংছড়ি, লামা, আলীকদম, থানচি, রুমা ও নাইক্ষ্যংছড়িতে ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে বসবাস করছে। এরমধ্যে সদর ও লামা উপজেলায় বসবাসকারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

স্থানীয়রা জানায়, প্রতিবছরই শুষ্ক মৌসুমে উন্নয়নের নামে পাহাড় কেটে বিভিন্ন এলাকার সড়কে সৃষ্ট গর্ত ভরাটসহ নতুন সড়কে মাটি দেওয়া হয়। এছাড়া অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কেটে বসতবাড়ি নির্মাণ করায় বৃষ্টিতে মাটি নরম হয়ে ঘরের ওপর পড়ে। যার কারণে মাটিচাপা পড়ে প্রাণহানি ঘটে অনেকের।

লামার ফাঁসিয়াখালী ইউপি চেয়ারম্যান জাকির হোসেন মজুমদার বলেন, ঝুঁকিতে থাকা বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। তবে কোথাও পাহাড় ধস, হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

পরিবেশবাদী বেসরকারি সংগঠনের দেওয়া তথ্যমতে, বান্দরবান সদর উপজেলার বালাঘাটা, কালাঘাটা, কাসেমপাড়া, ইসলামপুর, বনরূপা পাড়া, হাফেজঘোনা, বাসস্টেশন এলাকা, স্টেডিয়াম এলাকা, লাঙ্গিপাড়া, নোয়াপাড়া, কসাইপাড়া, রুমা উপজেলার হোস্টেলপাড়া, রনিনপাড়া, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার উত্তরপাড়া, বাইশফাঁড়ি, আমতলী, রেজু, তুমব্রুসহ সাত উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ের পাদদেশে অপরিকল্পিতভাবে বসতি গড়ে তুলেছে প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশি পরিবার। চলতি বছরেও গড়ে উঠেছে আরও নতুন নতুন বসতি। ফলে গত বছরের তুলনায় ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের সংখ্যা আরও বেড়েছে।

জেলা তথ্য অফিস থেকে জানা গেছে, ২০০৬ সালে জেলা সদরে তিনজন, ২০০৯ সালে লামা উপজেলায় শিশুসহ ১০ জন, ২০১০ সালে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় পাঁচজন, ২০১১ সালে রোয়াংছড়ি উপজেলায় দু’জন, ২০১২ সালে লামা উপজেলায় ২৮ জন ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় ১০ জন, ২০১৫ সালে লামায় চারজন, সিদ্দিকনগরে একজন ও সদরের বনরূপা পাড়ায় দু’জন এবং সর্বশেষ ২০১৭ সালের ১৩ জুন সদরের কালাঘাটায় সাতজন ও রুমা সড়কে ২৩ জুলাই পাঁচজন পাহাড় ধসে মারা গেছেন।

এদিকে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে কারণে ঢাকা, চট্টগ্রাম, মোংলা ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে রোববারও তিন নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগে দিনভর ভারী বর্ষণও হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা মাযহারুল ইসলাম বলেন, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, মোংলা ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত বহাল রাখা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগে আগামী ২৪ ঘণ্টা ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। রোববার বিকাল ৩টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৭৯ দশমিক ৪ মিলিলিটার বৃষ্টি হয়েছে বলে জানান তিনি।