১৯শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং | ৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২২শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরী

ছাত্রলীগের দৌরাত্ম্য থামছে না!


নিউজ ডেস্ক | PhotoNewsBD

৮ নভেম্বর, ২০১৯, ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ

বুয়েটের আবরারকে পিটিয়ে হত্যা, রাজশাহী পলিটেকনিকের অধ্যক্ষকে পানিতে চুবানো এবং সর্বশেষ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা- সবকিছুতেই ভিলেনের ভূমিকায় ঐতিহ্যবাহী এই ছাত্র সংগঠন। বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে দুই শীর্ষ নেতা শোভন-রাব্বানীকে সরিয়েও শুদ্ধ করা যায়নি ছাত্রলীগকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ প্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বার্তা বোঝেনি তারা।

লাগামহীন চাঁদাবাজি আর নির্মাণকাজ থেকে কমিশন দাবিসহ নানা অভিযোগের প্রমাণ পেয়ে চলতি বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাদের পরিবর্তে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয় সংগঠনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হয় জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে। এরপরই কঠোরতার আশ্রয় নেয় নেতারা। সারা দেশের ইউনিটগুলোকে শুদ্ধ হওয়ার বার্তা দেওয়া হয়। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি।

 

শোভন-রাব্বানীকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনার মাস না পেরুতেই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পিটিয়ে হত্যা করেছে আবরার ফাহাদ নামে এক শিক্ষার্থীকে। ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেওয়ার জের ধরে আবরার ফাহাদকে ৬ অক্টোবর রাতে ডেকে নিয়ে যায় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। এরপরই পিটিয়ে হত্যা করা হয় তাকে।

 

এ ঘটনার মাস শেষ হওয়ার আগেই অকৃতকার্য শিক্ষার্থীকে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ না দেওয়ায় রাজশাহী সরকারি পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের অধ্যক্ষকে লাঞ্ছিতের পর পানিতে ফেলে দেয় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। চলতি মাসের ৩ তারিখ এ ঘটনা ঘটায় ছাত্রলীগ। আর সবশেষ গত মঙ্গলবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এতে শিক্ষকসহ অন্তত ৩৫ জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

 

বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের বেপরোয়া হয়ে ওঠার চিত্র চিরচেনা। নানা অপরাধের সঙ্গে যুক্ততা স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে বেশ আগেই। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা শিক্ষাঙ্গন ও পাড়া-মহল্লা, নগরে-বন্দরে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, দরপত্র ছিনতাই, ঠিকাদারি বেচা-কেনাসহ নানা অপরাধে মেতে ওঠে। এ ‘স্বাভাবিক’ ঘটনায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ছেদ ঘটালেও পুরনো অভ্যাস থেকে ফিরতে পারছে না ছাত্রলীগ। প্রধানমন্ত্রীর কড়া বার্তা বুঝতে সময় নিচ্ছে তারা।

 

তবে ছাত্রলীগ নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে সংগঠনটি। প্রধানমন্ত্রীর বার্তা বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগলেও অন্যায়কারীদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে ছাত্রলীগ। এ প্রসঙ্গে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য খোলা কাগজকে বলেন, ‘দল তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকায় কিছু নেতাকর্মী বেপরোয়া হয়ে গেছে। এর বাইরেও এলাকাভিত্তিক রাজনীতির কারণে সবাই ছাত্রলীগকে ব্যবহার করতে চায়। এর থেকে উত্তরণে একটু সময় লাগছে। তবে কোনো অন্যায়কারীকে আমরা ছাড় দিচ্ছি না। কোনো অপরাধীর স্থান ছাত্রলীগে হবে না।’

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। বাংলা, বাঙালির স্বাধীনতা ও স্বাধিকার অর্জনের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের জন্ম। দেশের বিভিন্ন সংকটে ছাত্রলীগের ভূমিকা প্রশংসনীয়। কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই পাল্টে যেতে থাকে সংগঠনটি।

 

গত ১১ বছর ধরে ছাত্রলীগ মূলত আলোচনায় এসেছে হত্যা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, টেন্ডারবাজিসহ নেতিবাচক কারণে। গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগের নিজেদের কোন্দলে নিহত হন ৩৯ জন। আর এই সময়ে ছাত্রলীগের হাতে প্রাণ হারান অন্য সংগঠনের ১৫ জন।