২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১৩ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

তাসকিনের লড়াইয়ে ফেরার গল্প


ফটোনিউজবিডি ডেস্ক: | PhotoNewsBD

১০ মে, ২০২১, ১২:৪২ অপরাহ্ণ

শ্রীলঙ্কা টেস্ট সিরিজে বাংলাদেশ যতটা না পেয়েছে, তার থেকে বেশি হারিয়েছে। দলগতভাবে সিরিজ হার তো ছিলই। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ছিল ওঠানামা। ব্যাটিংয়ে যুতসই পারফরম্যান্স থাকলেও বোলিংয়ে মনে রাখার মতো ছিল শুধুমাত্র তাসকিন আহমেদের। দীর্ঘদিন পর জাতীয় দলে ফিরে ডানহাতি পেসার যে ধারাবাহিকতা দেখিয়েছেন তা বাংলাদেশের পেস আক্রমণে বিরল। ম্যাড়মেড়ে উইকেটে বোলিংয়ে বৈচিত্র্য, প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানকে আক্রমণ, ধারাবাহিক বোলিংয়ে প্রাণ ধরে রাখার কাজটা তাসকিন করে দেখিয়েছেন সিদ্ধহস্তে। প্রতিকূল সময় পার করে তিনি নিজেকে মেলে ধরার চেষ্টায় আছেন। নতুন মোড়কে ফেরা এ পেসারের লড়াইয়ের প্রতিটি অধ্যায় জানার চেষ্টা করেছি আমরা। সঙ্গে ভবিষ্যৎ ভাবনার কথাও জানিয়েছেন তাসকিন

কোথায় আছি, কী করছি?

ইনজুরি। বাদ পড়া। অফফর্ম। ফিটনেসের দুরবস্থা। আত্মবিশ্বাস তলানিতে। তাসকিন আহমেদের নিজের সঙ্গে নিজের হিসাব মেলে না। কিভাবে সামনের পথ চলবেন। এমনিতেই জাতীয় দলের পেস আক্রমণ স্বয়ংসম্পূর্ণ। রুবেল হোসেন, মোস্তাফিজুর রহমান, আল-আমিন, শফিউল ইসলাম, নবাগত হাসান মাহমুদ জায়গা করে নিয়েছেন। তার জায়গা কোথায়? পাইপলাইনে শরিফুল ইসলাম, মেহেদী হাসান রানার মতো প্রতিশ্রুতিশীল পেসারও রয়েছে। তার ঠিকানা কোথায়? এসব ভাবনা এতটাই গ্রাস করেছিল যে, রাতে চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পেতেন অথৈ সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছেন তিনি! কোথাও কূল খুঁজে পাচ্ছেন না। মনে তার একটাই প্রশ্ন, ‘কোথায় আছি, কী করছি।’

নিজেকে গড়তে প্রয়োজন শৃঙ্খলা

উঠতি বয়সে ফূর্তি জাগে না কার? তাসকিন কী সেই দলের বাইরে! জাতীয় দলে অভিষেক ২০ বছর বয়সে। তারও আগে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলছেন নিয়মিত। ব্যাংকে কাড়িকাড়ি অর্থ ও আশেপাশে বন্ধু-বান্ধবের ভিড়। তাসকিন সেই গোলকধাঁধায় আটকে গেলেন। বিপদগামী হননি। তবে ক্রিকেটে থেকেও তিনি ছিলেন না। ছিলেন না বলে পারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতা নেই। ছিল না দৃঢ় মনোসংযোগ, সংকল্পবোধ। নিজেকে পরের ধাপে নিতে, অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গড়ে তুলতে নতুন করে তৈরি করার প্রয়োজন অনুভব করলেন। সবার আগে জীবনে ফিরিয়ে আনলেন শৃঙ্খলা। তাতেই অর্ধেক কাজ এগিয়ে যায়।

লড়াইয়ের শুরুটা নিজের সঙ্গে

নিজেকে নতুন করে গড়ার জন্য সব বাজে অভ্যাসগুলো বাদ দিয়েছেন তাসকিন। রাত জেগে মোবাইল চালানো, দেরি করে ঘুমাতে যাওয়া, বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে দিন-রাত আড্ডা, কথায় কথায় ঘুরতে যাওয়া, সময় নিয়ে উদাসীনতাসহ আরও কত কিছু। জীবনে শৃঙ্খলা চলে আসে হুট করে। আর ভাবনায় পরিবর্তন আসে বাবা হওয়ার পর। নিজ মুখেই তাসকিন বলেন, ‘ছেলে পৃথিবীতে আসার পর হুট করেই যেন দায়িত্বটা বেড়ে গেল। নিজেকে পরিবর্তনের বাড়তি তাড়না অনুভব করলাম। আমি তো ক্রিকেট খেলোয়াড়। ক্রিকেট খেলে আমাকে কাটাতেই হবে। এখন যদি গাফিলাতি করি, তাহলে আমি শেষ। সেই ভাবনা থেকে আমার কাজ করা শুরু।’

শুরুতেই অগ্নিপরীক্ষা

তারকা পেসাররা কী করেছেন? নিজেদের ফিটনেস নিয়ে কাজ করে বোলিংয়ে বৈচিত্র্য এনে সফল হয়েছেন। বোলিং প্রত্যেকের সহজাত। যে যেভাবে পারে উন্নতি করেছে। কিন্তু ফিটনেস সেই বোলিং, আগ্রাসনকে নিয়ে গেছে ভিন্ন মাত্রায়। তাসকিনের মাথায় গেথে গেলো, ফিটনেস ট্রেনিং। সঙ্গে মাইন্ড ট্রেনিং বাড়তি শক্তিমত্তা যোগ করে। পুনর্বাসনের সময়ে তাসকিন নিজেকে গড়েছেন নতুন করে। গত বছর করোনার কারণে সব যখন থমকে গিয়েছিল, তখন ব্যক্তিগত ট্রেনার নিয়োগ দিলেন। তাকে নিয়ে রাতদিন চলে কার্যক্রম। জিমে ওয়েটলিফটিং, আউটডোরে তপ্ত বালির ওপর দৌড়ানো। আর মাইন্ড ট্রেনিংয়ের অংশ হিসেবে আগুনের ওপর হেঁটেছেন, আধঘণ্টা-এক ঘণ্টার ধ্যানেও বসেছেন, হাই জাম্প, লং জাম্পের কাজ করেছেন। সবই তার ফেরার যুদ্ধ।

এরপর বল হাতে ফেরার যুদ্ধ

ফিটনেসে নিজের উন্নতি টের পাওয়ার পর তাসকিনের আসল কাজ শুরু। বল হাতে ২২ গজে ফেরার লড়াই। সেই লড়াইয়ে তাসকিন একটি বিষয়ে কোনও আপোষ করবেন না সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ‘আমি গতি নিয়ে কোনও আপোষ করবো না তা আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। প্রয়োজনে বাড়াবো, কমাবো না।’ মিরপুরের একাডেমি মাঠে ঘাম ঝরানো একেকটি অনুশীলনে তাসকিন খাটেন গতি, সুইং, বাউন্স নিয়ে। বৈচিত্র্য আনার প্রচেষ্টায় সেশন টু সেশন বোলিং করেছেন। কখনও ৬-৭ ওভারের একেকটি সেশন। আবার কখনও ৩-৫ ওভারের। কখনও লাল বলে বোলিং করেছেন। কখনও সাদা বলে। অফস্টাম্পের বাইরের চতুর্থ ও পঞ্চম স্টাম্প বরাবর বল করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করেছেন। বাউন্সগুলো যেন আগ্রাসী হয় সেজন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। খেটেছেন ইয়র্কার বল নিয়েও। থ্রি কোয়ার্টার ডেলিভারিতে নিয়েছেন বাড়তি তালিম। সিমের ওপর বল পড়ে যেন মুভমেন্ট করে সেজন্য মরা উইকেটে বোলিং করেছেন। সেসব উইকেটে বাড়তি কিছু দেওয়ার থাকে না। আদায় করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেটেছেন ডানহাতি পেসার।

পেছনের রূপকার

লকডাউনে যখন সারাদেশ বন্ধ তখন মাসেল মেনিয়ার ইন্সট্রাক্টর দেবাশীষ দত্তকে নিয়ে তাসকিনের ফিটনেস ট্রেনিং শুরু হয়। দীর্ঘ লকডাউনে তাকে নিয়ে চলে সেই কার্যক্রম। এরপর মাইন্ড ট্রেনিং করেছেন সাবিত ইন্টারন্যাশনাল-এ। সেসব কাজে মাঠের বাইরের সুফলতা পেয়েছেন। ২২ গজে তাকে নতুন মোড়াকে ফিরিয়েছেন বোলিং কোচ মাহবুব আলী। প্রেরণা, আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর কাজটা করেছেন খালেদ মাহমুদ সুজন। সব কিছুর যোগফলে করোনা প্রাদুর্ভাবের পর ক্রিকেট মাঠে গড়ালে বিসিবি প্রেসিডেন্ট কাপে ২৬.২৮ গড়ে ৭ উইকেট নিয়ে তাসকিন পান ‘কামব্যাক ফ্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট’-এর পুরস্কার। এরপর জাতীয় দলের অনুশীলনে ঢুকে তাকে ঘষামাজা করেছেন ওটিস গিবসন। তার কাছ থেকে পাওয়া দীক্ষা অনেক কাজে আসছে বলে বিশ্বাস করেন তাসকিন।

এখন শুধু সামনে এগিয়ে চলা

কথায় আছে, দেয়ালে পিঠ ঠেকলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার তাড়ণা পাওয়া যায়। তাসকিনের বেলায় এমনটাই ঘটেছিল। আলোচনার বাইরে চলে গিয়েছিলেন তিনি। কোথাও ছিলেন না। হারিয়ে যাওয়া তাসকিন নিজেকে নতুন মোড়কে ফিরিয়ে বড় কিছুর আশা দেখাচ্ছেন। তাসকিনও একই স্বপ্ন দেখছেন। ‘অনেক কিছু হারিয়ে বুঝেছি। বাংলাদেশ যখন খেলত আমি তখন দর্শক। কতটা কষ্ট পেতাম তা কাউকে বলতে পারিনি। আবার নিজেকে ফিরে পেয়েছি। এখনও অনেক কাজ বাকি। আমি ক্রিকেটার, আমাকে ক্রিকেটারের মতো শৃঙ্খল থাকতে হবে। তৈরি হতে হবে নতুন চ্যালেঞ্জের জন্য। সকল বাঁধা পেরিয়ে যেতে হবে।’