২১শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ৮ই জমাদিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি

পানি কমলেও বাড়ছে ভাঙন


| PhotoNewsBD

২৮ জুলাই, ২০১৯, ১২:৪৫ অপরাহ্ণ

টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে দ্বিতীয় দফায় বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। তবে কিছু কিছু এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও দেখা দিয়েছে নদী ভাঙন। এছাড়া দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। ছড়িয়ে পড়ছে ডায়রিয়া, আমাশয় ও চর্মরোগ। বিস্তারিত জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে-

ময়মনসিংহ : গৌরীপুর উপজেলার ভাংনামারী ইউনিয়নের আটটি গ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে বেশকিছু বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ঝুঁকিতে রয়েছে আরও কিছু বাড়িঘর। এছাড়াও মাঝেরটেক, চর ভাবখালী ও উজান কাশিয়ার চর ব্রহ্মপুত্রের পানিতে প্লাবিত হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ১০ বছর ধরে ভাংনামারী ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম ব্রহ্মপুত্র নদে ভাঙছে। বহু পরিবার নিজেদের বাড়িঘর ও ফসলের জমি হারিয়ে গ্রামছাড়া হয়েছে। কিন্তু সরকারি উদ্যোগে বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি। প্রতি বছর অল্প অল্প করে ভাঙলেও বাঁধ নির্মাণ হয়নি। চলতি বর্ষায় ১৫ দিন আগে থেকে ভাঙন শুরু হয়েছে। ছয় বছর আগে ভাংনামারী ইউনিয়নের খোদবক্সপুর গ্রামে বাঁধ নির্মাণের জন্য গ্রামবাসী নিজেদের মধ্য থেকে চাঁদা ওঠান। সেই টাকায় বালুর বস্তা দিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণ করা হয়। তবে সেই বাঁধ পরের বছর ভেঙে যায়। এরপর ভাঙন রোধে আর কোনো বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি।

এ বিষয়ে ভাংনামারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মফিজুন নূর খোকা বলেন, চলতি বছর আবারও ভাঙন দেখা দেওয়ায় মানুষ বিপাকে পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও ব্যক্তি উদ্যোগে ভাঙনকবলিত ও পানিবন্দি পরিবারের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ময়মনসিংহ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ময়মনসিংহ জেলার ঝুঁকিপূর্ণ ৭০টি স্থানে ৩২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ওই প্রকল্পের আওতায় ভাংনামারী ইউনিয়নের গ্রামগুলোতেও বাঁধ নির্মাণ করা হবে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর বর্ষার শুরুতেই ব্রহ্মপুত্র নদঘেঁষা ভাংনামারী ইউনিয়নের অনন্তগঞ্জ, ভাটিপাড়া, ভাংনামারীর চর, বয়ড়া, খোদাবক্সপুর, দুর্বাচর, গজারিপাড়া, খুলিয়ারচর গ্রামে ভাঙন দেখা দেয়। এতে বেশকিছু বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। পানিতে তলিয়ে গেছে সড়ক, কালভার্টসহ সহস্রাধিক একর ফসলি জমি।

সম্প্রতি ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বাড়ায় প্লাবিত হয়েছে ভাংনামারী ইউনিয়নের মাঝেরটেক, চর ভাবখালী, উজান কাশিয়ার চরের শতাধিক ঘরবাড়ি। ওইসব পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের পানিতে তলিয়ে গেছে অনন্ত খেয়াঘাট। নদের পানিতে ডুবে গেছে বয়রা বাজারের প্রবেশপথ। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছে মানুষ।

গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানা করিম বলেন, প্লাবিত তিনটি গ্রামের মানুষের মধ্যে সরকারিভাবে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। দ্রুত পানি না কমলে আরও ত্রাণের ব্যবস্থা করা হবে।

চৌহালী (সিরাজগঞ্জ) : দ্বিতীয় দফায় যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধি ও তীব্র স্রোতে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানা সদরে শুরু হয়েছে ভাঙন। বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি ও বিভিন্ন স্থাপনা। গত শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ব্রাহ্মণগ্রামে আধা ঘণ্টার ব্যবধানে প্রায় ১২টি বসতভিটা যমুনায় বিলীন হয়ে গেছে। নদীপাড়ের বাসিন্দারা ভাঙন আতঙ্কে তাদের ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়া হলে থানা সদরের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনা নদীতে বিলীনের আশঙ্কা স্থানীয়দের।

গতকাল শনিবার দুপুরে সরেজমিন দেখা গেছে, যমুনায় বন্যার পানি বৃদ্ধির সময় নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেন্ড হাসপতাল ও বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন দক্ষিণে ব্রাহ্মণগ্রামে যমুনার স্রোতে আছড়ে পড়ছে। এ কারণে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বসতভিটা ও ফসলি জমি, ধর্মীয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নদী ভাঙনে শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে অল্প সময়ের ব্যবধানে দেবে গেছে ইসহাক মুন্সি, আমিরুল, আজিজুল, আদম আলী, আলী আকবর ও মঙ্গল চাঁদের বসতভিটা।

স্থানীয় আব্দুর রহমান জানান, একদিকে বন্যায় বাড়িঘর তলিয়ে গেছে। অপরদিকে নদী ভাঙনে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি। প্রতিদিন নদীপাড়ে ডাকাতের উৎপাত এলাবাসীকে উদ্বিগ্ন করে ফেলেছে। এখনই যদি ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয় তাহলে বিলীনের আশঙ্কায় রয়েছে এনায়েতপুর কাপড়েরর হাট, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, থানা ভবন, পাঁচিল-সিরাজগঞ্জ আঞ্চলিক সড়ক, বহু তাঁত কারখানা ও পাঁচটি গ্রাম।

স্থানীয়দের অভিযোগ, যমুনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর গতিপথ পাল্টে ভাঙন শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে নদীতে চলে গেছে বহু স্থাপনা। এরপরও ভাঙন রোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না দায়িত্বপ্রাপ্ত জনপ্রতিনিধিরা।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম জানান, শুক্রবার রাতের ব্রাহ্মণগ্রামে যমুনার ভাঙনে ঘরবাড়ি বিলীনে খবর পেয়েছি। ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া আছে। কাজও চলমান আছে। তবে বন্যার কারণে বালু সংগ্রহে সমস্যা হওয়ায় বিলম্ব হচ্ছে। আশা করছি দ্রুত কাজ শুরু হবে।

নীলফামারী : তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নীলফামারীতে বন্যা পরিস্থিতির আরেক দফা উন্নতি হয়েছে। গতকাল শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

পানি উন্নয়ন বোর্ড নীলফামারীর ডালিয়া বিভাগের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে শনিবার সকাল ৬টায় নদীর পানি বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। এরপর চার সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে সকাল ৯টা ও বেলা ১২টা পর্যন্ত ৩৪ সেন্টিমিটার এবং বিকেল ৩টায় চার সেন্টিমিটার কমে ৩০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও সন্ধ্যা ৬টায় আবারও পাঁচ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর বিপদসীমা ৫২ দশমিক ৬০ মিটার।

এর আগে ১৩ জুলাই তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে অতীতের সব রের্কড ভেঙে বিপদসীমার ৫০ সেন্টিমিটার দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ সময়ে তিস্তাপাড়ের মানুষ বন্যাক্রান্ত হয়ে চরম বিপাকে পড়ে। প্রথম দফায় বন্যার ধাক্কা সামাল দিতে না দিতেই এক সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফায় দুর্ভোগে পড়ে এসব মানুষ।

ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ময়নুল হক বলেন, ‘তিস্তার পানি বিপদসীমার নিচে নামলেও এখকও বাড়া-কমার মধ্যে রয়েছে নদীর পানি। ফলে দুর্ভোগ কমছে না মানুষের। প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় বন্যাকবলিত মানুষের মাঝে পর্যায়ক্রমে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত আছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড নীলফামারীর ডালিয়া বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রবিউল ইসলাম বলেন, শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। নদীতে পানি বাড়া-কমার মধ্যে থাকায় ব্যারেজের সব কয়টি গেট খোলা রাখা হয়েছে।

কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে এখনও ধরলা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় অববাহিকার চরাঞ্চলসহ নিম্নাঞ্চলের ঘরবাড়ি থেকে পানি নেমে যায়নি। ফলে এসব এলাকার বন্যাদুর্গত মানুষজন ঘরে ফিরতে পারছে না। কবলিত এলাকায় ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ পানিবাহিত রোগ দেখা দিয়েছে। এবারের বন্যায় জেলায় এ পর্যন্ত পানিতে ডুবে ১৭ শিশুসহ ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

সিভিল সার্জন ডা. এসএম আমিনুল ইসলাম জানান, জেলার বন্যা দুর্গতদের জন্য ৮৫টি মেডিকেল টিম কাজ করছে। মেডিকেল টিম বন্যা দুর্গত এলাকার মানুষজনের মাঝে পানি বিশুদ্ধকরণ টেবলেট সরবরাহ করা ছাড়াও পানিবাহিত রোগের চিকিৎসা দিচ্ছে।

স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানান, সেতু পয়েন্টে ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ১৪ সেন্টিমিটার ও চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ১৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক মোছা. সুলতানা পরভীন জানান, বন্যায় জেলার নয় উপজেলায় প্রায় সাড়ে নয় লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছিল। বন্যার্তদের জন্য এ পর্যন্ত সরকারিভাবে এক হাজার টন চাল, ১০ হাজার ৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবার ও ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও বন্যাকবলিত এলাকার শিশু ও গবাদি পশুর খাদ্য কেনার জন্য দুই লাখ করে চার লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

গাইবান্ধা : গাইবান্ধার নদ-নদীগুলোর পানি কমতে শুরু করেছে। তবে ব্রহ্মপুত্র নদ ও ঘাঘট নদীর পানি এখনও বিপদসীমার উপরে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল শনিবার বিকেল ৩টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার ও ঘাঘট নদীতে ১৬ সেন্টিমিটার উপরে ছিল। করতোয়া নদীর পানি বিপদসীমার ৫৪ সেন্টিমিটার নিচে ছিল। শনিবার সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদের পানি চার সেন্টিমিটার, ঘাঘট নদীর পানি পাঁচ সেন্টিমিটার এবং করতোয়া নদীর পানি ১০ সেন্টিমিটার কমেছে।

এদিকে, বন্যায় গাইবান্ধা জেলার সাত উপজেলায় ৫৯৩ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা ও ২৬৬ কিলোমিটার পাকা রাস্তা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এছাড়াও জেলার বিভিন্ন রাস্তার ৩৯টি কালভার্টেরও ক্ষতি হওয়ায় যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। বসতবাড়ি থেকে এখনও পানি সরে যায়নি। গাইবান্ধা পৌর এলাকাসহ জেলার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র ও উঁচু বাঁধে রয়েছে বানভাসি মানুষগুলো। তারা এখনও ঘরে ফিরতে পাচ্ছে না।

জেলার অধিকাংশ এলাকা দীর্ঘদিন বন্যাকবলিত হয়ে থাকায় শ্রমজীবী মানুষ অর্থ সংকটে পড়েছে। সেজন্য নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর অধিকাংশ ত্রাণের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বন্যাকবলিত এলাকাসহ বাঁধ ও আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। সিভিল সার্জন ডা. এবিএম আবু হানিফ বলেন, সাত উপজেলার বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষের জন্য ১০৯টি মেডিকেল টিম কাজ করছে।

জেলা প্রশাসক অফিস জানিয়েছে, বন্যায় ফুলছড়ি উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের ৭৯ গ্রাম, সাঘাটার ১০টির মধ্যে নয়টি ইউনিয়নের ১০২ গ্রাম, সদরের ১৩টির মধ্যে ১১টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৫৩ গ্রাম, সুন্দরগঞ্জের ১৫টির মধ্যে আটটি ইউনিয়নের ৫৩ গ্রাম, গোবিন্দগঞ্জের ১৭টির মধ্যে নয়টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার ১০০ গ্রাম, পলাশবাড়ীতে নয়টির মধ্যে তিনটি ইউনিয়নের ৩৫ গ্রাম এবং সাদুল্যাপুরে ১১টির মধ্যে দুটি ইউনিয়নের দুটি গ্রাম প্লাবিত হয়। সাত উপজেলার ৪২৪টি গ্রামের পাঁচ লাখ ৯৭ হাজার ৪৯৭ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬৩ হাজার ১৭০টি।

তাদের বেশীরভাগই নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে এসে উঠছে। ১৯৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৬৫ হাজার ১৭ জন মানুষ আছে। এছাড়া আউশ ধান, আমন বীজতলা, পাট ও শাকসবজি বন্যার পানিতে ১৪ হাজার ২১ হেক্টর নিমজ্জিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৩৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ১০৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালরে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। ১১ হাজার ৫টি নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এ পর্যন্ত জেলায় এক হাজার ৩০০ টন চাল ও ২৭ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে গাইবান্ধা সদরে চাল ৩১০ টন ও পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টাকা, সুন্দরগঞ্জে চাল ২৩০ টন ও পাঁচ লাখ টাকা, সাঘাটায় চাল ৩৪৮ টন ও ছয় লাখ ৭৫ হাজার টাকা, ফুলছড়িতে ৩৩৭ টন চাল ও আট লাখ ২৫ হাজার টাকা, সাদুল্যাপুরে চাল পাঁচ টন, পলাশবাড়ীতে চাল ২৫ টন, গোবিন্দগঞ্জে ৪৫ টন ও এক লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

ইসলামপুর (জামালপুর) : জামালপুরের ইসলামপুরে বন্যার পানি গত তিনদিন বেড়ে আবারও কমতে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্ট যমুনার পানি ১৭ সেন্টিমিটার কমে শনিবার সকালে বিপদসীমার ৩৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

এদিকে ১০-১২ দিনে ধরে ইসলামপুর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে বন্যা হ্রাস-বৃদ্ধির ফলে পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। এতে লাখ লাখ বন্যা আক্রান্ত মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে।

পত্নীতলা (নওগাঁ) : দ্বিতীয় দফায় আত্রাই নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে পত্নীতলা উপজেলায় বেশ কয়েকটি স্থানে নদী তীরবর্তী বেড়িরবাঁধ ভাঙার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। বর্তমানে নদীপাড়ের বাসিন্দারা চরম হতাশায় প্রহর কাটাচ্ছেন।

২০১৭ সালে উপজেলার পাটিচরা ও পত্নীতলা ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি বাঁধ ভেঙে ছয়টি ইউনিয়নের অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়। বিগত বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তরা আবারও চরম হতাশায় রয়েছেন। সচেতন মহলের দাবি, এভাবে আত্রাই নদীর পানি বৃৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে কয়েক দিনের মধ্যে নজিপুর পৌর এলাকার চাঁনপুর, পলিপাড়া, পাটিচরা ইউনিয়নের কাশিপুর, বহবলপুর, পশ্চিম পাটিচরা, নজিপুর ইউনিয়নের কাঞ্চন, ফহিমপুর, বিষ্টপুর, চকমূলি ডাঙ্গাপাড়া, বোরাম ও কাঁটাবাড়ি এলাকায় বাঁধ ভাঙার আশঙ্কা রয়েছে।

সিরাজগঞ্জ : উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নতুন করে যমুনা নদীতে পানি বাড়তে থাকায় সিরাজগঞ্জে আবারও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। যমুনা নদীর পানি বেড়ে আবারও বিপদসীমার আট সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিপাকে পড়েছেন ঘরে ফেরার অপেক্ষায় থাকা মানুষ। দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে তাদের। আবারও শুরু হয়েছে নদী ভাঙন। যমুনা নদীসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সদরের সাতটি, কাজীপুরে ১০টি, বেলকুচিতে ছয়টি, চৌহালীতে সাতটি এবং শাহজাদপুরে নয়টি ইউনিয়নের ঘরবাড়ি, তাঁত কারখানা, ধান, পাট, বীজতলা, বিভিন্ন সবজির ক্ষেত পানিতে ডুবে আছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এবারের বন্যায় জেলার ৩৯টি ইউনিয়ন, দুটি পৌরসভা, ৩৮৮টি গ্রামের তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৭৮ হাজার ৬৯৮ জন মানুষ আংশিক ও এক হাজার ১২৪ হাজার জন মানুষ সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪৩ হাজার ৮১৩টি। ক্ষতিগস্তরা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে ১৮৫টি।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী রণজিৎ কুমার সরকার জানান, সিরাজগঞ্জ হার্ড পয়েন্ট এলাকায় গত শুক্রবার যুমনার পানি বিপদসীমার ১২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত যমুনা নদীর পানি কমে বিপদসীমার আট সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

শাজাহানপুর (বগুড়া) : অবিরাম বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বাঙালি নদীর পানিতে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার আমরুল ইউনিয়নের নয়টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে আমন ধানের বীজতলা, পাট, পানের বরজসহ বিভিন্ন সবজির ক্ষেত। আর পাকা ও কাঁচা রাস্তা ডুবে যোগাযোগের একমাত্র বাহন হয়েছে নৌকা।

এ উউনিয়নের বন্যাকবলিত গ্রামগুলো হলো- লক্ষ্মীপুর, শৈলধুকরি, গোবিন্দপুর, ক্ষুদ্রফুলকোট, ফুলকোট, বড়নগর, রাধানগর, পলিপলাশ ও রাজারামপুর। বগুড়ার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবি) তথ্যমতে গতকাল শনিবার দুপুর পর্যন্ত বাঙালি নদীর পানি বিপদসীমার ৮৬.৭০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

ক্ষুদ্রফুলকোট গ্রামের কৃষক নূর আলম জানান, তার ১৬ শতক জমির আমন বীজতলা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। বীজগুলো দিয়ে তিনি ১৫ বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে পারতেন।

আমরুল ইউপি চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান অটল জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তাদের সহায়তা করা হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছা. ফুয়ারা খাতুন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ গ্রামগুলো পরিদর্শন করেছেন।

উপ-সহকারী কৃষি-কর্মকর্তা রেজাউল হক জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে আমরা তালিকা পাঠিয়ে দিয়েছি।