২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১৩ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

বেলা এখনো অনেক বাকি…


ফটোনিউজবিডি ডেস্ক: | PhotoNewsBD

১৬ জুলাই, ২০২১, ৬:০১ অপরাহ্ণ

মিনি সয়েল ডিগার বা মাটি খোঁড়ার ছোট মেশিনটি দাঁড়িয়ে আছে কবরস্থানের প্রধান ফটক পেরিয়ে একটু সামনের খোলা চত্বরে। মেশিনের সামনের ব্লেডটিতে নতুন মাটির ছোপ ছোপ দাগ। খানিকআগে ৮ নম্বর ব্লকে বেশ কয়েকটি কবর খোঁড়া হয়েছে এই মেশিনে। এখন গোসল করে, নামাজ পড়ে, খাওয়া-দাওয়ার পর একটু বিশ্রাম নেবেন মেশিনের চালক। তারপর, প্রয়োজন পড়লে আবার একই কাজ; কবর খোঁড়া।

ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর সোয়া ১২টা। মাটি খোঁড়ার ছোট সেই মেশিনের চালক আবুল হোসেন জানালেন, ‘আজ আর কবর খোঁড়ার দরকার হবে না। ৮টি কবর খুঁড়ে রাখা হয়েছে। সকাল থেকে ২ জনকে কবর দেওয়া হয়েছে। এখনও ৬টি খুঁড়ে রাখা কবর ফাঁকা। এই ব্লকে শুধুমাত্র করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া মানুষদের দাফন করা হয়।

গত বছরের তুলনায় এবছরে ঢাকায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে আসা লাশের সংখ্যা কম বলে জানালেন রায়ের বাজার কবরস্থানের কর্মী রফিক মিয়া। প্রতিদিন গড়ে ৮ নম্বর ব্লকে ৫-৬ জনের বেশি লাশ আসে না। রফিক মিয়ার বয়স বড় জোর ৪৫। দেখতে যদিও অনেক বেশি মনে হয়। কথাবার্তায় খুব একটা উৎসাহিত মনে হলে না তাকে। উদাসীন ভঙ্গিতে তাকালেন। প্রতিদিন চারপাশে মৃত মানুষের ভিড় দেখতে দেখতে সম্ভবত রফিক মিয়াও নিরাসক্ত এবং আবেগহীন!

কবর খোঁড়া, কবরের চারপাশে ঘাস লাগানো, ফুল গাছ আর সাইনবোর্ড লাগানোসহ কবরের সবরকম দেখ-ভাল, যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব পালন করে আসছেন গত প্রায় ১৫ বছর ধরে। জীবদ্দশায় তার বাবাও একই কাজ করতেন। বাবা মারা গেছেন তাও প্রায় এক যুগ। সেই থেকে ‘উত্তরাধিকার’ সূত্রেই সংসার চালানোর জন্য এই দায়িত্ব রফিক মিয়ার কাঁধে।

বছিলা এলাকায় বাপ-দাদার বাড়ি। সেখান থেকে প্রতিদিন এই কবরস্থানে আসেন সকালে। দিনভর এখানেই থাকেন। লাশ এলে দাফন-কাফনের কাজ করেন। প্রয়োজন হলে সন্ধ্যা-রাত পর্যন্ত থাকেন। কাজ শেষে রাতে ফিরেন বাড়িতে। দুপুরে ছেলে খাবার নিয়ে আসে বাসা থেকে। রফিক মিয়ার মতো আরও বেশ কয়েকজন আছেন রায়ের বাজারের এই কবরস্থান এলাকায়। পেশাও একই।

তেমনই একজন করিম মোল্লা জানান, কবরে যারা লাশ নিয়ে আসেন, তাদের মনটা খুব নরম থাকে। তাদের বাবা-মা বা আত্মীয়ের দাফনের কাজ শেষ হওযার পরে কবরের উপর গাছ-ঘাস লাগানো, সাইনবোর্ড লাগানোর জন্য ভালো পরিমাণ টাকা দেন। টাকার জন্য আমরা তেমন কোনো চাপ দেই না কাউকে। কেবল খরচের হিসাবটা দেই। তার বাইরে ১ থেকে ২ হাজার পর্যন্ত ওনারা খুশি হয়ে দেন। ওতেই আলহামদুল্লিাহ আমাদের চলে যায়।

প্রতিদিন এই কবরস্থানে সব মিলিয়ে ১৫-২০ জন মানুষকে দাফন করা হয় বলে জানালেন, মেইন গেইটে দায়িত্বরত আনসার সদস্য লোকমান সেলিম। প্রথম প্রথম লাশ দেখলে খারাপ লাগতো। সময়ের কারণে এখন সয়ে গেছে। এখন এসব আর তাকে স্পর্শ করে না। তারপরও হঠাৎ কোনো মৃত বাবা-মাকে কবর দিয়ে ফেরার সময় তাদের সন্তানদের আহাজারি সহ্য করতে পারেন না। তখন ধীরে ধীরে হেঁটে চলে যান, কবরের একদম ভেতরের দিকে। ঘন্টাখানেক পর আবার ফিরে আসেন গেটে। ততক্ষণ তার সহকর্মী গেট সামাল দেন।

কবরস্থান থেকে বেরিয়ে আসার সময় হয়ে এলো। ঠিক তখনই মেইন গেইটের কাছে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের আর্তি। ভেতরে লাশ। অ্যাম্বুলেন্সের পেছনে থাকা গাড়ি থেকে নেমে এলেন দুই ভদ্রলোক। তাদের বাবা আজ সকালে মারা গেছেন রাজধানীর একটা বেসরকারি হাসপাতালে। থাকতেন ধানমন্ডিতে। করোনা পজিটিভ হওয়ার মাত্র চার দিনের মাথায় বাবা মারা গেলেন। বাবাকে শেষ বিছানায় শুইয়ে দিতে এসেছেন দুই ভাই। বাবার নতুন স্থায়ী ঠিকানা এখন রায়েরবাজার কবরস্থানের ৮ নম্বর ব্লকে।

আরও একটি কবর ভরে গেল। রইলো বাকী ৫। কে জানে, আজ আবার মাটি খোঁড়ার ছোট মেশিনের চালক আবুল হোসেনকে কবর খুঁড়তে হয় কি না? মাথার ওপরে সুর্য এখনো গনগনে। বেলা এখনো অনেক বাকি…।