১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং | ২রা পৌষ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৮ই রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী

মুসলিম নির্যাতনে নীরবতা ও সরকারি দাওয়াতে আলেমদলের হজ্বে গমণ


অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার | PhotoNewsBD

২৫ জুলাই, ২০১৯, ১০:০১ অপরাহ্ণ

বিশ্বের নানা স্থানে মুসলিম নির্যাতন এখন সংবাদ হিসেবে খুবই স্বাভাবিক। এ অবস্থা ইউরোপীয় নানা উপনিবেশবাদ, নাস্তিক্যবাদী সমাজতন্ত্র ও ধর্মহীন সেক্যুলারিজমের রূপ নিয়ে মুসলিম বিশ্বের ওপর দুই তিন শতাব্দী ধরে চলছে। বিশেষ করে একশ’ বছর যাবৎ খেলাফতহীন বিক্ষিপ্ত মুসলিম উম্মাহ নানাভাবে চরম নির্যাতনের শিকার।

ফিলিস্তিনে কাশ্মীরে চীনা তুর্ক অংশে আসামে ইরাক সিরিয়া লিবিয়ায় নির্যাতন কেবল চলছেই। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস বাংলাদেশে পাক বাহিনী যে ধরনের মানবতাবিরোধী আচরণ করেছিল এরচেয়ে বহুগুণ বেশি জুলুম নির্যাতন ভারতীয় বাহিনী সত্তর বছর যাবৎ কাশ্মীরসহ ভারতের নানা অঞ্চলে নির্দ্বিধায় চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বসমাজ এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না। যথাযথ সোচ্চারও হচ্ছে না। কারণ এখানে তাদের কোন স্বার্থ নেই।

গত কিছুদিন ধরে ভারতজুড়ে ক্ষমতাসীন বিজেপি সমর্থকরা ভারতের স্বাভাবিক পরিস্থিতি বিনষ্ট করে চরম ধর্মীয় উগ্রবাদ তথা হিন্দু মৌলবাদনির্ভর আচরণ করছে। মুসলিমদের হত্যা, মারপিট, অবমাননা ও ভীতি প্রদর্শনসহ সব ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। যার খবরাখবর এক শ্রেণির নতজানু ও খরিদা মিডিয়া বেমালুম চেপে গেলেও বহির্বিশ্বের বহু মিডিয়া এ নিয়ে সংবাদ ও বিশ্লেষণ প্রকাশ করছে।

আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী মিডিয়া এসব বিষয় গুরুত্ব সহকারে যেভাবে এড্রেস করছে তাতে ভারতের ব্যাপক বদনাম হয়ে যাচ্ছে। সোস্যাল মিডিয়ার কল্যাণে পৃথিবীর মানুষ ভারতের উগ্রবাদীদের হিংস্রতা দেখতে ও জানতে পারছে। সে দেশের বিবেকবান নেতা ও বুদ্ধিজীবীরা এ নিয়ে মুখ খুলছেন। অমর্ত্য সেন, অরুন্ধতি রায় প্রমুখ খোলামেলা মন্তব্য করছেন। রামের নাম ব্যবহার করে নিরপরাধ ও নিরীহ মানুষ হত্যা করা হচ্ছে, এ নিয়ে সাধারণ হিন্দুরাও ব্যথিত। আরএসএস বজরং দল ইত্যাদি সংগঠন রীতিমতো বিশ্বব্যাপী নতুন একটি রূপ নিয়ে পরিচিত হচ্ছে।
ভারত সরকার যে পরিমাণ বদনামের ভাগী হয়েছে তা বিগত সাত দশকেও কোন দিন হয়নি। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ অদ্ভুত নীরবতায় আচ্ছন্ন। এর কারণ বা ব্যাখ্যা জনগণ বেশ ভালো করেই জানে। তারা সার্বিক অবস্থা বুঝতেও পারে। তবে ঈমানদার নেতৃবৃন্দ ও ইসলামী দল বা সংগঠনের আচরণ নিয়ে মানুষ হতাশায় নিমজ্জিত হয়। মুসলিম বিশ্বের যে কোন সমস্যা নিয়ে কথা বলা ব্যক্তি ও দলও চলমান এ সময়ে নীরব থাকায় সাধারণ মুসলমানরা বিস্মিত হয়।

ঈমানী দায়িত্ব পালনে মানুষের ন্যূনতম স্পৃহাটুকুও নেতারা হৃদয়ঙ্গম করতে পারছেন না; মনে করে মানুষ দুঃখ পায়। এরপর ধীরে ধীরে কিছু কথা বক্তৃতা বিবৃতি আসতে থাকে। অনেক বিলম্বে হলেও সম্প্রতি কিছু কর্মসূচিও বিভিন্ন সংগঠন দেয়। ঈমানী আন্দোলনের বৃহৎ অরাজনৈতিক প্লাটফর্ম হেফাজতে ইসলাম এ বিষয়ে কঠোর নীরবতা ও অখন্ড উদাসীনতার স্বাক্ষর রাখে।

কেন্দ্রীয়ভাবে মুখে কিছু বলা, একটি বিবৃতি দেওয়া, অন্তত প্রকাশ্যে দোয়া করা, দেশবাসীকে নফল ইবাদত কিংবা দোয়া মোনাজাতের আহ্বানও সংগঠনটির পক্ষ থেকে পাওয়া যায়নি। ব্যক্তিগতভাবে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর নামে একটি বিবৃতি তার ভক্তরা প্রচার করেছেন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের বিভিন্ন শাখা বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কর্মসূচি পালন করেছে। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দও সোচ্চার ছিলেন।

গত জুমার নামাজের পর খেলাফত মজলিস বাইতুল মোর্কারম এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে। এর আগের জুমায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বিক্ষোভ মিছিল করে। এরপর তারা জাতীয় প্রেসক্লাবে গোলটেবিল, সভা সমাবেশ, আগামী ২৯ জুলাই ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশন অভিমুখে মিছিলসহ স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি ঘোষণা করে। দেশের সাধারণ আলেম ওলামা, পীর মাশায়েখ ও ইমাম খতিবগণ দলনিরপেক্ষ ঈমানী প্রেরণায় মুসলিম নির্যাতনের নিন্দা প্রতিবাদ ও তাদের জন্য সমবেদনা দোয়া চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি মানুষের সমবেদনা মজলুম মুসলমানদের প্রাপ্য।

বাংলাদেশের সরকারের কুটনৈতিকভাবে ভারতের কাছে তার উদ্বেগ প্রকাশ করা ছিল স্বাভাবিক। দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে সব বাংলাদেশির কর্তব্য ভারতীয় মজলুম মুসলমানের পক্ষ অবলম্বন করে সোচ্চার হওয়া। কেননা এটি একটি পরীক্ষা। ভারতে যেভাবে বিজেপি সরকার দেশব্যাপী মুসলিম প্রধান এলাকায় নাগরিকত্ব বাতিলের কৌশল নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে এর কুফল তাদের ভোগ করতে হবে এতে কোন সন্দেহ নেই। দেওবন্দ দিল্লিসহ সারা ভারতে বড় বড় মুসলিম জমায়েত ও প্রতিবাদ বিক্ষোভ সে ইঙ্গিতই দেয়।

আসামের রাষ্ট্রহীন মানুষ শেষ পর্যন্ত যে বাংলাদেশের ওপরই চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হবে এটাও সহজে আন্দাজ করার মতো ব্যাপার। বাংলাদেশের মানুষ সোচ্চার হওয়ার সময় বয়ে যায়। রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যম ব্যর্থ হলেও সাধারণ মানুষ ব্যর্থ নয়। তারা তাদের মনোভাব জানান দেয়ার সুযোগ পেলেই তা দিয়ে দেয়। এখানে ইসলামী নেতৃত্বের ভ‚মিকা জনগণ লক্ষ্য করছে, ইতিহাসও তা নিপুণভাবে সংরক্ষণ করছে। আল্লাহর কাছে জবাব দেয়া ও নিজের ঈমানী দায়িত্ব পালনের তাগিদ যেন ইসলামী অঙ্গনকে সচল রাখে। তারা যেন আল্লাহর চেয়ে মানুষকে বেশি ভয় না করেন।

এ বছরই প্রথম দেশবরেণ্য পঞ্চান্নজন আলেম ও শায়েখকে সরকার রাষ্ট্রীয় খরচে হজ করাচ্ছেন, যা একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ রীতি চালু করে একটি ভালো কাজ করেছেন। দেশের নানা চিন্তা ও মতের এমন সমন্বিত গ্রুপ অতীতে খুব কমই দেখা গেছে। মন্ত্রণালয় বা অন্য যেই এ বাছাইটি করে থাকেন খুব দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। হেফাজত ও হেফাজতবিরোধী উভয় ধরনের আলেম একসাথ করা হয়েছে। একটি অঞ্চলের লোকজন বেশি সংখ্যায় না নিয়ে দেশের আরো কিছু এলাকা শামিল করলে তালিকাটি বেশি সুন্দর হতে পারত।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অন্যান্য সূত্র থেকে যেসব কথা পাওয়া যাচ্ছে, সেসব কথাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। যেমন কাকতালীয়ভাবে হলেও কয়েকজন পিতা-পুত্র বিশিষ্ট ও দেশসেরা ওলামা মাশায়েখের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ব্যাপারটি কিছুটা হলেও হালকা হয়ে গেছে। এমন কিছু বয়োবৃদ্ধ ও নানা রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত আলেমের নামও এসেছে যারা হাজীদের ধর্মীয় নির্দেশনা বা কোনরূপ খেদমত করতে পারবেন বলে মনে করা যায় না।
কারণ তাদের অনেকেই কঠিন হৃদরোগী, হুইল চেয়ারে চলেন, ওষুধনির্ভর জীবন, তাদের সচল রাখতেই একাধিক খাদেমের প্রয়োজন হয়। তাছাড়া এমন আলেমও আছেন যারা বিশ ত্রিশবার হজ করেছেন। রাষ্ট্রীয় খরচে হজ করতে তারা আগ্রহীও ছিলেন না। এখন একরকম পরিবেশগত চাপের মুখেই পাসপোর্ট জমা করছেন।

অনেকে আবার নিজের তাকওয়াগত ইমেজ নষ্টের আশঙ্কাও করছেন। এসব ক্ষেত্রে হজে যাওয়া না যাওয়ার স্পষ্ট এখতিয়ার রেখে প্রথমেই তাদের প্রস্তাব করা উচিত ছিল। নাম ঘোষণার পর অনেকে বিব্রত হলেও এখন না যাওয়ার কথা বলতে পারছেন না। আলেমদের রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা বা সরকারের আনুক‚ল্য গ্রহণ না করার অতীত ঐতিহ্য রয়েছে। যেমন, যুগে যুগে অসংখ্য ওলামা মাশায়েখ কোন বড় কারণ না থাকা সত্তে¡ও কেবল নিজের আধ্যাত্মিক স্বচ্ছতা ধরে রাখার জন্য এসব অফার ফিরিয়ে দিয়েছেন।

কিছুদিন আগেও চরম অসুস্থতার সময় হাসপাতালের বেডে শুয়ে আটক করা পাসপোর্ট ফিরে পান আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী। কিন্তু সরাসরি সরকার প্রধানের তরফ থেকে বিদেশে চিকিৎসার আহ্বান পেয়েও তিনি শাসকদের আনুক‚ল্য গ্রহণ করে বিদেশে চিকিৎসা নিয়ে কোনরূপ দায়বদ্ধ হতে চাননি। বিনয়ের সাথে আহ্বান ফিরিয়ে দিয়েছেন।

সরকার নানা সময় বহু মানুষকে হজে নেয়, চিকিৎসা ও গাইড দেয়ার কাজে। মন্ত্রী সচিব ও বিশিষ্টজনেরা যান হজ টিমে। ওলামা-মাশায়েখ হজযাত্রীদের ধর্মীয় নির্দেশনা ও দীনী খেদমতের নামে যাচ্ছেন এবারই প্রথম। এখানে দুটি বিষয় খেয়াল করলে এ গ্রুপটি নিয়ে কোন বিরূপ আলোচনার সুযোগ মানুষ পেত না। এক, সরকারের রাজনৈতিক কোন উদ্দেশ্য এতে নেই তা স্পষ্ট হয়, তালিকাটি এভাবেই বাছাই হওয়া উচিত ছিল। দুই, প্রকৃতই হাজীদের ধর্মীয় ও মানবিক খেদমতে নিজেকে নিবেদিত রাখতে পারেন এমন যোগ্য ও দক্ষ আলেম তালিকায় থাকলে ভালো হত। যারা নিজ উদ্যোগে হজে যেতে পারেন না অথচ অনেক মহব্বত ও স্পৃহা হৃদয়ে লালন করেন। সরকারের এ সিদ্ধান্ত প্রশংসনীয়, তবে এ নিয়ে আরো সচেতনভাবে এগুতে হবে।

 

লেখকঃ সদস্য- ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ( ডিইউজে ) আহবায়কঃ জাতীয় জনতা-ফোরাম / ব্যবস্থাপনা সম্পাদক- দৈনিক আপন আলো!