২২শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ৯ই জমাদিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি

রক্তদান ও মানবিক দায়


মোহাম্মদ আবু তাহের | PhotoNewsBD

৫ মে, ২০১৯, ১১:৩৬ পূর্বাহ্ণ

স্বেচ্ছা রক্তদাতারা হলেন মানুষের জীবন বাঁচানোর আন্দোলনের দূত। ভালো কাজে মানুষ সবসময় অন্যকে দেখে উদ্বুদ্ধ হয়। বন্ধু রক্ত দিচ্ছে দেখে তার আরো বন্ধু রক্ত দিতে উদ্বুদ্ধ হয়। রক্তদান একটি মানবিক দায়বদ্ধতা, সামাজিক অঙ্গীকার। যিনি যে পেশায়ই থাকুন না কেন সমাজের জন্যে তার কিছু না কিছু করার আছে। ১ ব্যাগ রক্তদানের মাধ্যমেও তিনি পালন করতে পারেন সামাজিক অঙ্গীকার। রক্তদান করা কল্যাণমূলক কাজের মধ্যে শ্রেষ্ট কাজ।

 

মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা সৎ কাজের বিনিময় বা প্রতিদান উত্তম পুরস্কার ব্যতিত আর কি হতে পারে? সুরা আর রহমান আয়াত-৬০। পৃথিবীতে যত সৃষ্ঠি আছে তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে মানুষ। পাশাপাশি পৃথিবীতে যত প্রাণী আছে তার মধ্যে সবচেয়ে দূর্বল মানুষ। দূর্বল ও অসহায় মানুষ পৃথিবীতে বেঁচে থাকে শুধুমাত্র নিজের শক্তিতে নয় অন্য মানুষের সহযোগিতায়। এরিস্টটল বলেছেন মানুষ সামাজিক প্রাণী। সে বেঁচে থাকে তারই মত মানুষের শুভবোধের কারনে। ভূপেন হাজারিকার গানের কথাগুলো আমাদের অনুপ্রেরণা যোগায়। মানুষ মানুষের জন্য/ জীবন জীবনের জন্য/ একটু সহানুভুতি কি মানুষ পেতে পারেনা? মানুষের জীবনে মানুষের ভুমিকা, চেনা অচেনা অনেক মানুষের সাহায্য সহযোগিতা, ভালবাসায় আমরা বেঁচে থাকি, আমদের জীবনকে সমৃদ্ধ করি, যেমন আমরা রক্তদানের প্রয়োজনীয়তা, উপকারিতা নিয়ে সেমিনার করছি। শেখ বুরহান উদ্দিন ইসলামী সোসাইটি, মৌলভীবাজার অসহায় মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এ মহৎ উদ্যোগটি গ্রহন করেছে। তরুণ শিক্ষার্থী ও সমাজকর্মীদের দেয়া রক্তে মানুষ বেঁচে থাকবে, সুখী হবে।

 

 

রক্তদানের গুরুত্ব/উপকারিতা:

মানসিক তৃপ্তি- একবার অন্তত ভাবুন, আপনার রক্তে বেঁচে উঠছে একটি অসহায় শিশু, একজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষ।সে মুহূর্তে আপনার যে মানসিক তৃপ্তি তাকে কখনোই অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা করা সম্ভব নয়।

 

শারীরিক উপকারিতা- রক্তদান স্বাস্থের জন্য অত্যন্ত উপকারী। রক্তদান করার সাথে সাথে আমাদের শরীরের মধ্যে অবস্থিত ‘বোন ম্যারো’ নতুন কণিকা তৈরির জন্যে উদ্দীপ্ত হয়। দান করার দ্্্ইু সপ্তাহের মধ্যেই নতুন রক্ত কণিকা জন্ম হয়ে এই ঘাটতি পূরণ করে। আর প্রাকৃতিক নিয়মেই যেহেতু প্রতি ৪ মাস পর পর আমাদের শরীরের রেড সেল বদলায়,তাই বছরে ৩ বার রক্তদান রক্তদাতার লোহিত কণিকাগুলোর প্রাণবন্ততা আরো বাড়িয়ে দেয়। তাই রক্তদান করলে দেহ রক্তশূন্য হয়ে পড়ে এটি ভুল ধারণা। যুক্তরাজ্যের এক মেডিকেল পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নিয়মিত স্বেচ্ছা রক্তদাতারা জটিল বা দূরারোগ্য রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্ত থাকে। রক্তদাতার হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেক কম।

 

 

ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয় সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনষ্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক এম হাফিজুল ইসলাম তাঁর এক বক্তব্যে বলেন, আমি প্রথম রক্ত দেই ষাট এর দশকে তখন আমি ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয়ের ছাত্র। আমার এক রুমমেটের বোনের অপারেশন হয়েছিলো। রক্তের যোগাড় কীভাবে হবে এই ভেবে সে ব্যাকুল হয়ে কাঁদছিলো। আমি তাকে রক্ত দিলাম। শুনে পুরো হলে তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। আমাদের হলের হাউজ টিউটর দৌঁড়ে এলেন, আমি সুস্থ আছি কি না। মাথা নেড়ে তিনি বলতে লাগলেন, রক্ত দেয়ার আগে মা-বাবার অনুমতি নেয়া উচিত। অর্থাৎ রক্তদান সম্পর্কে অনেক ভুল ধারণা সে সময় ছিলো। রক্ত দিলে কোনো শারীরিক সমস্যা হয় না- এ কথা তখন কেউ বুঝতো না। তিনি বলেন, আমরা পর্যবেক্ষণ থেকে দেখেছি যারা নিয়মিত রক্ত দেন তারা অনেক সুস্থ থাকেন, দীর্ঘজীবী হন। শুধু তা-ই নয় মানসিকভাবেও তারা সুখী জীবনের অধিকারী হন। আমি ৬৩ বার রক্ত দিয়েছি এটি কোনো গর্বের বিষয় নয়, বরং আমি মনে করি এর মাধ্যমে ৬৩ জন মানুষের খেদমত করতে পেরেছি আমার দেহের সামান্য অংশ দিয়ে। আর এই দেয়ায় আমার তো কোনো ক্ষতি হয়ই নি, বরং সুস্থ, সুখী ও পরিতৃপ্ত জীবন পেয়েছি। ষাটোর্ধ্ব বছর বয়সে এসেও আমার ডায়াবেটিস নেই। ব্লাড প্রেসার কিংবা হার্টের কোনো সমস্যা নেই। দিনে ১৭/১৮ ঘন্টা কাজ করেও আমি ক্লান্তি অনুভব করি না। আমার বিশ্বাস, নিয়মিত রক্তদানের ফলে সু্স্থুতার এই নেয়ামত আমি অর্জন করেছি। কেননা রক্তদানের মাধ্যমে আমি কিছু মানুষের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেছি। সৃষ্টির সেবার এই অনন্য সুযোগ পাওয়ার ফলে প্রাকৃতিক নিয়মেই আমি ভালো থাকছি, সুস্থ থাকছি। অর্থাৎ স্বেচ্ছায় রক্তদানে রক্তদাতার শারীরিক ক্ষতির কোনো সম্ভাবনা নেই বরং তা রক্তদাতার শারীরিক সুস্থতাকে অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়। রক্তদান রোগমুক্ত জীবন যাপন করার সুযোগ এনে দেয়।

 

 

বর্জন করুন পেশাদার রক্ত বিক্রেতাদের রক্ত:
শুধু রক্ত হলেই হবে না, জীবনের জন্য চাই বিশুদ্ধ রক্ত। স্বেচ্ছা রক্তদাতাদের পরীক্ষিত রক্তই হতে পারে এর একমাত্র সমাধান। বাংলাদেশে রক্তের বিশাল চাহিদার মধ্যে নূন্যতম পরিমান রক্ত আসে স্বেচ্ছা রক্তদাতাদের মাধ্যমে। বেশিরভাগ রক্তই আসে পেশাদার রক্ত বিক্রেতা ও আত্মীয়-স¦জনের কাছ থেকে। আর পেশাদার রক্ত বিক্রেতাদের অধিকাংশই সিফিলিস, ম্যালেরিয়া, হেপাটাইটিস-বি বা এইডস্-এ আক্রান্ত। ফলে এই দূষিত রক্ত পরিসঞ্চালিত হয়ে রক্ত গ্রহীতা প্রায়শই আক্রান্ত হন দূরারোগ্য ব্যাধিতে। দূষিত রক্তের অভিশাপ থেকে মুমূর্ষু মানুষকে রক্ষা করার জন্যে প্রয়োজন নিরাপদ ও সুস্থ রক্তের, প্রয়োজন সচেতন মানুষের স্বেচ্ছা রক্তদান। কারণ স্বেচ্ছায় রক্তদানের মাধ্যমে যেকোনো স্স্থু মানুষ নিজের ক্ষতি না করে মুমূর্ষু মানুষকে বাঁচাতে পারে। ইউরোপে প্রতি হাজারে ৬০-৮০ জন স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন। আমাদের দেশে ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদ্বুদ্ধমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে স্বেচ্ছায় রক্তদানকারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

 

ধর্মীয় দৃিষ্টতে- রক্তদান ধর্মীয় দিক থেকেও অত্যন্ত পুণ্য বা সওয়াবের কাজ। এটি এমন একটি দান যার তাৎপর্য সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের সূরা মায়েদার ৩২ নং আয়াতে বলা হয়েছে,‘একজন মানুষের জীবন রক্ষা করা সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করার মতো মহান কাজ।’ ঋগবেদে বলা হয়েছে ‘নিঃশর্ত দানের জন্যে রয়েছে চমৎকার পুরষ্কার। তারা লাভ করে আশীর্বাদধন্য দীর্ঘজীবন ও অমরত্ব।’ আসলে সব ধর্মেই রক্তদানকে উৎসাহিত করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি বড় ইবাদত।

 

রক্তদানে আপনার অংশগ্রহণ হতে পারে নিম্নরূপ:

নিজে আজীবন রক্তদাতা হোন । ১৮-৬০ বছর বয়সী যে কেউ ন্যূনতম ওজন ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হলে রক্ত দিতে পারেন।
আপনার জন্মদিনকে স্মরণীয় করে রাখতে রক্তদান করতে পারেন।
জীবনের যেকোনো শুভদিন বা শুভ ঘটনাকে রক্তদানের মাধ্যমে আনন্দময় করে তুলুন।
রোজা রেখেও রক্ত দান করা যায়। এতে ৭০ ব্যাগদানের বরকত আপনি লাভ করতে পারেন।
শারীরিকভাবে সক্ষম না হলে নিজে দিতে না পারলেও পরিচিতদের রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করুন।
নিজ এলাকায় বা প্রতিষ্টানে ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্প আয়োজনে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করুন। পরিচিত বন্ধু-বান্ধবদের রক্ত দিতে উদ্বুদ্ধ করুন।
আর্থিক অনুদানের মাধ্যমে রক্তদান কার্যক্রমকে জোরদার করুন। সফল ও সার্থক মানুষ হোন।

 

 

আমরা সবাই সফল ও সার্থক হতে চাই, সফল সেই মানুষ যে পৃথিবী থেকে নেয় বেশী। সার্থক সেই মানুষ যে পৃথিবীকে দেয় বেশী। খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আব্দুল্লাহ্ আবু সায়ীদ বলেছেন “ আমরা জন্মেছি সফল হওয়ার জন্য, আমরা জন্মেছি একটা গৌরবজনক মৃত্যুর জন্য। মৃত্যুর আধ ঘন্টা আগেও সক্রেটিস তার শিষ্যদের সাথে অমরত্বের বিষয়ে আলাপ করছিলেন। আমরা মৃত্যুকে কতটা মহিমান্বিত করতে পারি সেটা একটি মানুষের স্বপ্ন হওয়া উচিত। ব্যক্তিগত উন্নয়নের আমেরিকান লেখক নেপোলিয়ান হীল ও ডব্লিউ ক্লেমেন্ট স্টোন সাকসেস থ্রো এ পজিটিভ মেন্টাল এটিটিউট গ্রন্থে সাফল্যের সতেরটি সূত্র উল্লেখ করেছেন, সাফল্যের এই সূত্রগুলো লেখকদের উদ্ভাবন নয়। লেখকরা তাদের গবেষণায় সেই দেশের শত শত সফল ব্যক্তিদের পর্যালোচনা করেছেন তারপর এই সূত্রগুলো আবিস্কার করেছেন।

 

 

সাফল্যের সতেরটি সূত্র:
১. একটি ইতিবাচক মনোভাব, ২. উদ্দেশ্যের নির্দিষ্টতা, ৩. সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া, ৪. যথার্থ চিন্তা, ৫. আত্মশৃঙ্খলা, ৬. ঐক্যমন দল (মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত), ৭. খোশমেজাজ ব্যক্তিত্ব, ৮. ব্যক্তিগত উদ্যোগ, ৯. ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা, ১০. গভীর আগ্রহ, ১১. নিয়ন্ত্রিত মনোযোগ, ১২. সঙ্গবদ্ধ কাজ, ১৩. আস্থা রাখা, ১৪. সৃজনশীল রূপকল্প ( ভবিষ্যত পরিকল্পনা), ১৫. সময় ও অর্থকে হিসাব করা এবং পরিকল্পনার আওতায় আনা, ১৬. দেহ ও মনের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখা, ১৭. মহাজাগতিক বল প্রয়োগ করা/বিশ^জনীন সূত্রাবলী প্রয়োগ করা ( আমি পারি, আমি পারব, আমার জীবন আমিই গড়ব)।

 

 

একটি গল্প দিয়েই লেখাটি শেষ করতে চাই :
গল্পে একজন বৃদ্ধ সমুদ্রের বেলাভূমি দিয়ে হাটছেন আর কিছুক্ষণ পরপর আপন মনে বালুর ওপর ঝুঁকে কিছু একটা তুলে সমুদ্রে ছুঁড়ে মারছেন। এ অবস্থা দেখে এক যুবক কৌতুহলী হলো। কাছে এসে সে দেখলো বৃদ্ধ আসলে সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে ভেসে আসা স্টার ফিসগুলোর একটি/দুটিকে এভাবে বালি থেকে তুলে সমুদ্রে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। দেখে সে বিস্মিত হলো। বৃদ্ধের বোকামি দেখে মজাও পেলো। জিজ্ঞেস করলো, “সমুদ্রের একটা ঢেউয়ের সাথে লাখ লাখ স্টারফিস ভেসে এসে বালিতে আটকে যায়। কিন্তু আপনি তো এভাবে ছুঁড়ে ছুঁড়ে তাদের কয়েকটি মাত্র বাঁচাতে পারেন। বাকিদের কী হবে?”শুনে বৃদ্ধ বললেন, “ দেখ, সবাইকে আমি বাঁচাতে পারবো না। আমার সাধ্য এটুকুই। কিন্তু তারপরও যে কয়েটিকে আমি বাঁচাতে পেরেছি তাদের কাছে এটিই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমার সাহায্যটুকুই তার জীবন এবং মরনের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টির কারণ। অতএব এর গুরুত্ব অনেক বেশি।” এ গল্পটির শিক্ষা ছিলো যে পৃথিবীর সব লোকের সব সমস্যা সমাধান করার সাধ্য হয়তো আমাদের নেই। তারপরও যতটুকু সাধ্য আছে তা নিয়েই আমাদেরকে এগিয়ে আসতে হবে মানবতার কল্যাণে। তাহলেই সে ক্ষুদ্র প্রয়াস সার্থক হবে। আর সে কাজটাই রক্তদাতারা করেছেন নিজ রক্তের বিনিময়ে লক্ষ প্রাণ বাঁচানোর উদ্যোগ নিয়ে। শেখ বুরহান উদ্দিন ইসলামী সোসাইটি, মৌলভীবাজার এর ‘রক্ত দিন জীবন বাঁচান’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখে। এই সামাজিক সংগঠন তাদের সাধ্যমতো সামাজিক দায়িত্ব পালন করে মানব কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। সকল মানুষেরই যার যার অবস্থান থেকে মানব কল্যাণে কাজ করা দরকার। সেমিনার থেকে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

 

 

লেখক:

ব্যাংকার, গবেষক ও কলামিস্ট
taherpbl@gmail.com

 

(সম্মানিত পাঠক, ফটোনিউজবিডি ডটকমে নিয়মিত কলাম লিখছেন বিশিষ্ট কলামিস্ট মোহাম্মদ আবু তাহের। পড়তে চোখ রাখুন শুধুমাত্র ফটোনিউজবিডি ডটকমে। ধন্যবাদ।)