১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং | ২রা পৌষ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৮ই রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী

লাইলাতুল ক্বদর: এক বরকতময় মহিমান্বিত রজনী


মোঃ জসীম উদ্দিন, দোহা (কাতার) | PhotoNewsBD

৩১ মে, ২০১৯, ৯:০৭ অপরাহ্ণ

লাইলাতুল ক্বদর’ মুসলিম উম্মাহর কাছে অত্যন্ত মহিমান্বিত একটি রজনীর নাম। এ রাতে গভীর আবেগে আপ্লুত হয় প্রত্যেকটি মুমিনের হৃদয়। বারোটি মাসের দীর্ঘ বিরতির পরে পাওয়া এ মহান রজনীতে মহান আল্লাহর করুণা লাভের আশায় ব্যাকুল হয়ে ওঠে সকল মুমিন – মুসলমানের হৃদয়।

 

লাইলাতুল ক্বদরের বৈশিষ্ট্য ও মাহাত্ম্য :

এ মহান রাতের মর্যাদা বর্ণনা করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা কোরআনুল কারিমে একটি পূর্ণাঙ্গ সুরা অবতীর্ণ করেছেন, সুরা ক্বদরে আল্লাহ বলেন ঃ নিশ্চয়ই আমি ইহা (কোরআন) লাইলাতুলকদরে নাজিল করেছি। আর হে নবি আপনি কি জানেন লাইলাতুলকদর কি? লাইলাতুলকদর হল হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। এ রাতে ফেরেস্তা ও রুহ আল্লাহর অনুগ্রহে প্রত্যেকটি ব্যাপারে জমিনে অবতরণ করে। আর তারা শান্তির বাণী শুনায়। আর ফজর উদয় হবার পূর্ব পর্যন্ত এরকম করতে থাকে”।

 

কোরআন ও হাদিস থেকে লাইলাতুলকদরের যে মর্যাদা ও মাহাত্ম্য জানা যায় তা হলো:

(১) পবিত্র কোরআন নাজিল : কদরের রাতে মহান আল্লাহ সর্বপ্রথম পবিত্র কোরআন নাজিল করেন।
(২) হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রেসালাত অর্জন কুদরতের রাতেই হজরত মুহাম্মদ (সা.) প্রথম ওহি লাভ করেন এবং রেসালাত অর্জন করেন। এরশাদ হয়েছে,‘নিশ্চয়ই আমি ইহা (কোরআন) নাজিল করেছি কদরের রাতে। (সুরাতুল কদর : ১)
(৩) হজরত জিবরাঈল ও রহমতের ফিরিশতাদের আগমন : হজরত জিবরাঈল (আ.) নবী ও রাসুলদের কাছে ঐশী বাণী নিয়ে পৃথিবীতে আসতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের মাধ্যমে নবুয়ত ও রেসালাতের ধারা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হজরত জিবরাঈলের পৃথিবীতে আগমনও বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বছরে একবার মাত্র কদরের রাতে আল্লাহর নির্দেশে রহমতের একদল ফেরেশতাকে সঙ্গে নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করেন। এরশাদ হয়েছে,‘এ রাতে ফিরিশতারা এবং রূহ (জিবরাইল আ.) প্রত্যেক কাজের জন্য তাঁদের পালনকর্তার নির্দেশসহ অবতীর্ণ হন।’ (সুরাতুল কদর : ৪) (৪) তাকদির লিখন : শবে কদরে সমগ্র সৃষ্টির আগামী এক বছরের ভাগ্য লিপিবদ্ধ করা হয়। অর্থাৎ লওহে মাহফুজ থেকে তা নকল করে ফেরেশতাদের হাতে অর্পণ করা হয়। সুরাতুল কদরের ‘মিন কুল্লি আমরিন’ অংশের তাফসিরে কাতাদাহ প্রমুখ মুফাসসিরগণ বলেন, এ রাতে যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং মানুষের হায়াত,মউত,রিজিক,দৌলত ইত্যাদি নির্ধারণ করা হয়। (ইবনে কাসির)
(৫) ফিরিশতাদের দোয়া : হজরত ইমাম শা’বী (র.) লিখেছেন, লাইলাতুল কদরে ফেরেশতারা মসজিদবাসী মুমিনদের জন্য শান্তির দোয়া করতে থাকেন।
(৬) কদরের পূর্ণ রাতটি কল্যাণময় : এরশাদ হয়েছে,‘রাতটি ফজর উদিত হওয়া পর্যন্ত কল্যাণময়।’ (সুরাতুল কদর : ৫)

 

লাইলাতুল কদরের ফজিলত:

লাইলাতুল কদরের ফজিলত সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন,‘লাইলাতুল কদর সম্পর্কে তুমি কী জানো? কদরের রাত এক হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম।’(সুরাতুল কদর : ২,৩)
লাইলাতুল কদরের ফজিলত সম্পর্কে বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণীত হয়েছে আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন যে ব্যাক্তি ঈমান ও ইহতেসাবের সাথে লাইলাতুল ক্বদরে নামাজে দন্ডায়মান থাকবে তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।
অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : এ মাসে এমন একটা রাত আছে যা এক হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। যে ব্যক্তি এ রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয় সে সত্যিকারের কপাল পোড়া। (ইবনে কাসির) অর্থাৎ একটি মাত্র রাত ‘লাইলাতুল কদরের’ ইবাদতের সওয়াব একাধারে তিরাশি বছর ইবাদত করার চেয়েও বেশি।

লাইলাতুল ক্বদর কোন রাত? এ সম্পর্কে অনেক মতানৈক্য রয়েছে। তবে অধিকাংশ মুহাক্কিক এর মত হলো,মাহে রমজানের শেষ দশ দিনের যে কোনো বেজোড় রাতে লাইলাতুল কদর হতে পারে। আর এ মতটাই দালিলিকভাবে বিশুদ্ধ বলে মনে হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : তোমরা রমজান মাসের শেষ দশ দিনে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো (সহীহ আল-বোখারী : ২০১৭, সহিহ মুসলিম : ১১৬৭, ইবনে মাজা : ১৭৬৬, সুনানে আবু দাউদ : ১৩৮১, মুসনাদে আহমাদ : ২৫৬৯০)

 

লাইলাতুল কদরের আমল:

কদরের রাতটি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিন বান্দার জন্য বিশেষ এক উপহার। তাই ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে সে সুযোগটাকে কাজে লাগানোই মুমিনের কাজ। যে কোনো ইবাদতের মাধ্যমেই আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা যেতে পারে। তা নামাজ আদায়, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির আযকার, দোয়া- মোনাজাত, দান – সদকা ইত্যাদি। অনেকে বলে থাকেন, শবে কদরে একশত রাকাত নফল নামাজ পড়তে হবে এবং প্রথম রাকাতে সুরা কদর এবং দ্বিতীয় রাকাতে সুরা ইখলাস পড়তে হবে। এটা একেবারেই ভুল এবং মূর্খ লোকদের কথা। নফল নামাজ কোনো সময়েই নির্দিষ্ট সংখ্যক রাকাত এবং নির্দিষ্ট সুরা দিয়ে পড়ার বাধ্যবাধকতা নেই।

 

লাইলাতুলকদরের দোয়া:

হজরত আয়েশা (রা.) একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, হে আল্লাহর রাসুল! লাইলাতুল কদর কোন রাত সেটা যদি আমি বুঝতে পারি তাহলে আমি তাতে কি দোয়া করব? তখন রাসুলুল্লাহ (স.) বললেন, তুমি বলবে ,‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি’, অর্থাৎ হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমাশীল, তুমি ক্ষমা করতে ভালোবাসো অতএব তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। (জামে আত্-তিরমিজি : ৩৫১৩, সুনানে ইবনে মাজা : ৩৮৫০, আস্-সুনানুল কুবরা : ৭৬৬৫, মুসনাদে আহমাদ : ২৫৩৮৪, বায়াকি- শুআবুল ইমান : ৩৪২৬)

 

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা তিনি যেন তাঁর এ বরকতময় রাতের ফয়েজ ও বরকত থেকে আমাদের বঞ্চিত না করেন। আমীন

 

(সম্মানিত পাঠক, ফটোনিউজবিডি ডটকমে দোহা (কাতার) থেকে নিয়মিত কলাম লিখছেন বিশিষ্ট কলামিস্ট মোঃ জসীম উদ্দিন। পড়তে চোখ রাখুন শুধুমাত্র ফটোনিউজবিডি ডটকমে। ধন্যবাদ।)