১৭ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ৭ই জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

সামাজিক দূরত্ব লঙ্ঘন করে বিয়ে: হাডলাইনে সরকার


ফটোনিউজবিডি ডেস্ক: | PhotoNewsBD

১৪ এপ্রিল, ২০২০, ৫:১৪ অপরাহ্ণ

করোনাভাইরাসের এ পরিস্থিতির মধ্যেও থেমে নেই বিয়েশাদি। বাসাবাড়িতে চুপিসারে বিয়েশাদি হচ্ছে। সামাজিক দূরত্ব লঙ্ঘন করে দেশের বিভিন্নস্থানে বিয়ের ঘটনাও ঘটছে। করোনার ঝুঁকির মধ্যে জমায়েত করে ঘটাকরে বিয়ে করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে ধরাও পড়েছে অনেকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। অনেককে তাৎক্ষণিক জরিমানা গুণতে হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংক্রমণরোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিয়েশাদিসহ সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মাঠ প্রশাসন রাতদিন কাজ করছে। এ বিষয়ে সরকার এখন হার্ডলাইনে।

করোনা ভাইরাসের এ পরিস্থিতে বিয়েশাদি বন্ধ? নাকি সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে বিয়েশাদি করা যাবে এমন প্রশ্ন অনেকের।

মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ এ পরিস্থিতিতে বিয়েশাদিসহ সামাজিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। তবে এজন্য সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে, একেবারে ঝুঁকিমুক্ত নিশ্চিত করতে হবে। বাসা-বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠান ছাড়া কাজী, বর-কনে ও তাদের মা বাবাসহ সর্বোচ্চ ৫ থেকে ৬ জনের উপস্থিতিতে বিয়েশাদির সুযোগ রয়েছে। তবে কোনোভাবেই ক্লাবে, কমিউনিটি সেন্টারে জমায়েত হয়ে বিয়েশাদি করা যাবে না। আইন লঙ্ঘন করে কেউ বিয়েশাদি করলে সঙ্গে সঙ্গে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন এলাকায় কঠোরভাবে নজরদারি করছে। তারা জনগণকে কড়া বার্তা দিয়ে রেখেছেন।

সামাজিক দূরত্ব লঙ্ঘন করে বিয়েশাদির বিষয়টি কিভাবে দেখছেন জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুল ইসলাম বলেন, এ পরিস্থিতিতে বিয়েশাদির ব্যাপারে আমরা জনগণকে বলে দিয়েছি, (এটা আসলে প্রজ্ঞাপন আকারে না) বিয়েশাদি চলমান থাকবে। তবে সেটা সামাজিক দূরত্ব লঙ্ঘন করে নয়, বরং বাসাবাড়িতে করতে হবে। কিন্তু কোনোভাবেই জমায়েত করা যাবে না, শতভাগ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা হয়েছে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। বিয়েশাদির ক্ষেত্রে শুধু কাজী সাহেব আসবেন, হয়তো ছেলের বাবা, মেয়ের বাবা এলেন, সবমিলিয়ে ৫ থেকে ৬ জন থাকবেন।

সামাজিক দূরত্ব লঙ্ঘন করে বিয়েশাদিসহ কোনো অনুষ্ঠানই করতে দেওয়া হচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, সামাজিক দূরত্ব লঙ্ঘন করে কোনো অনুষ্ঠান করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে- এই বার্তা অলরেডি জনগণের কাছে চলে গেছে। জনগণও সচেতন হচ্ছে। এর সুফলও আমরা পাচ্ছি। আশা করছি করোনাভাইরাসের ভয়াবহতার বিষয়টি চিন্তা করে সবাই বিয়েশাদি, হাটবাজার সবকিছুতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখবেন।

তারপরও যদি কেউ আইন লঙ্ঘন তাহলে কী হবে? জবাবে মাঠ প্রশাসনের এ কর্মকর্তা বলেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা এ ধরনের ঘটনা ঘটলেই অ্যাকশনে যাচ্ছি। ইতোমধ্যেই আমার এলাকায় অপরিচিত মানুষ নিয়ে এক সরকারি কর্মকর্তার বিয়ের খবর শুনেই আমরা তাৎক্ষণিক মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা করেছি। পরে তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছে।

করোনা ভাইরাসের পরিস্থিতিতে সামাজিক দূরত্ব লঙ্ঘন করে যাতে বিয়েশাদি না হয় সেজন্য হার্ডলাইনে সরকার। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে বিষয়টি সিরিয়াসলি মনিটরিং করা হচ্ছে। মাঠ প্রশাসন যাতে ঠিকমত কাজ করে সেজন্য জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, সামাজিক দূরত্ব লঙ্ঘন করে বিয়েশাদিসহ যে কোনো বিষয়ে মাঠ প্রশাসনে কড়া বার্তা দেওয়া আছে। আমাদের সংক্রমণরোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ আইন যেটা আছে সেটার আলোকে তাদের গ্রেফতার করা যাবে, মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া যাবে। সেটা আমরা প্রয়োগ করছি। মূলত এ বিষয়ে সরকার হার্ডলাইনে রয়েছে।

তিনি বলেন, সমাগম ঘটে এমন কোনো কিছুই এখন করা যাবে না। করোনার এ পরিস্থিতিতে ঘরে থাকার কোনো বিকল্প নাই। বিপদের একেবারে ভিন্ন বিশেষ পরিস্থিতিতে আমরা এখন আছি। আমরা শুধু নিজেদের বাঁচানো না, অন্য সবাইকে বাঁচানো। দেশকে বাঁচাতে, অর্থনৈতিক গতি ধরে রাখতে বিশেষ এ পরিস্থিতিতে ঘরে থাকার বিকল্প নাই।

ফরহাদ হোসেন বলেন, এক এলাকা থেকে এলাকায় যেখানে প্রবেশ করা যাচ্ছে না সেখানে বিয়েশাদি তো প্রশ্নই আসে না। সামাজিক দূরত্ব লঙ্ঘন করে বিয়েশাদির এমন এমন ঘটনা হয়তো দু-একটা। বেশির ভাগ মানুষ এখন সচেতন হয়ে গেছে। কোথাও এমন কিছু দেখলে জনগণই এখন জানিয়ে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরব, গণমাধ্যমও বিশাল ভূমিকা রাখছে। করোনায় ঝুঁকি বাড়বে এমন সব বিষয় সম্পর্কে আল্লাহর রহমতে মানুষ এখন অনেক বেশি সতর্ক ও সচেতন। প্রশাসন আইন মানিয়ে, বুঝিয়ে যেভাবে হোক না কেন মানুষকে আমরা সচেতন করতে পেরেছি। এটা এখন সারাদেশের চিত্র। মানুষকে ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখাই আমাদের বড় অর্জন।

মাঠ পর্যায়ে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে করোনামুক্ত করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় জনপ্রশাসন নেতৃত্ব দিচ্ছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে জেলা প্রশাসকদের শুধু বলে দেওয়া হয়েছে তা নয়, আমরা বিষয়টি সরাসরি দেখছি। সার্বক্ষণিক একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যোগাযোগ রাখছি। রাতদিন কাজ করছি। প্রধানমন্ত্রীও বিষয়টি ২৪ ঘণ্টা তদারকি করছেন। করোনা পরিস্থিতিতে মাঠ পর্যায়ের যে কোনো সমস্যা তাৎক্ষণিক সমাধানের জন্য সবসময় সক্রিয় রয়েছেন বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।

সামাজিক দূরত্ব লঙ্ঘন করে বিয়েশাদি না করার বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা মাঠ পর্যায়ে কিভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে জানতে চাইলে ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, পাবলিক ওপেন কোনো জায়গায় কিংবা কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ে হচ্ছে না। এটা আমরা অ্যালাও করছি না। পাবলিকলি কোনো বিয়ে হচ্ছে না। কোথাও হচ্ছে কিনা আমার জানা নেই। এখন যদি একদুই জন ঘরের মধ্যে গিয়ে কলেমা পড়ে সেটা ভিন্নকথা। কিন্তু খাওয়া দাওয়া, অনুষ্ঠান, জমায়েত করে বিয়েশাদি নিষিদ্ধ। এককথায় বর্তমান পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠান করে বিয়ে করার কোনো সুযোগ নাই।

সামাজিক দূরত্ব না মেনে বিয়ের ব্যাপারে প্রশাসন কী পদক্ষেপ নিচ্ছে জবাবে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, আমরা সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে বন্ধ করে দিচ্ছি। মাঠ পর্যায়েও এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের বলে দেওয়া হয়েছে এবং তার সে অনুযায়ী কাজ করছেন বলেও জানান তিনি।

করোনা ভাইরাসের এ পরিস্থিতিতে বিয়েশাদিসহ যে কোনো কিছুতে সামাজিক দূরত্ব শতভাগ নিশ্চিত করতে সচেতনতার বিকল্প নাই বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন।

তিনি বলেন, এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সামাজিক দূরত্ব শতভাগ নিশ্চিত করতে সচেতনতার কোনো বিকল্প নাই। নিজেদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। জনগণকে সচেতন করা ছাড়া এটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। যতটুকু আইন প্রয়োগ করে, ভয়ভীতি দেখিয়ে সম্ভব করা হচ্ছে। সচেতনতার মাধ্যমে বাকীটা করতে হবে।

সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে করোনা পরিস্থিতিতে ৭ এপ্রিল সোনারগাঁও উপজেলার সনমান্দি ইউনিয়নে লোকজন নিয়ে ঘটা করে আমিনপুর পৌরসভার পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক শাহীন কবির উপজেলার সনমান্দি গ্রামের জামাল উদ্দিনের মেয়ে নাদিয়া আক্তারকে বিয়ে করেন। খবর পেয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত ১০ হাজার টাকা জরিমানাও করে। এঘটনায় পরে চাকরি থেকে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

কিছুদিন আগে করোনার মধ্যেও সাতক্ষীরার সদর উপজেলার দেবহাটার পারুলিয়া বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রীর সঙ্গে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আবু সাঈদের গোপনে বিয়ের আয়োজনের খবর পেয়ে স্থানীয় প্রশাসন বিয়ে বন্ধ করে দেয় এবং বর ও কনে পক্ষকে জরিমানা করে।

তাছাড়া সাভারের আমিনবাজার ইউনিয়নের সালেহপুর এলাকায় বিয়ে বাড়িতে হানা দিয়ে দিয়ে র‍্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত বিয়ে বন্ধ করে দেয় এবং উভয় পক্ষের মোট আটজনকে ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করে।