১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১২ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

১০ বছরে ৮ বার বিদ্যুতের দাম বাড়ল


| PhotoNewsBD

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ৭:১৯ অপরাহ্ণ

দেশের মানুষের জীবনযাপনের খরচ আরও বাড়ছে। এমনিতে গত কয়েক মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রধান পণ্যগুলোর দাম বেড়েছে। চালের দাম বাড়ানো হয়েছে কয়েক দফা। বেড়েছে চিনি, ভোজ্যতেল, ডাল, পেঁয়াজ ও রসুনের দাম। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতিও হঠাৎ লাফ দিয়েছে। সব মিলিয়ে মধ্যম ও নিম্ন আয়ের মানুষ যখন সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখনই বিদ্যুৎ ও ঢাকা ওয়াসার পানির দাম বাড়াল সরকার।

শহর এলাকায় একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসে ভ্যাট ছাড়া বিদ্যুৎ বিল দিতে হতো ২ হাজার ৪৩৩ টাকা। এ ধরনের গ্রাহকের আগামী এপ্রিল থেকে ১৩৩ টাকা বাড়তি দিতে হবে। তাদের এখন দিতে হবে ২ হাজার ৫৬৬ টাকা। এতে লাইফ লাইন (হতদরিদ্রদের জন্য সর্বনিম্ন হার) ছাড়া ছয়টি ধাপে আবাসিক গ্রাহকের সর্বনিম্ন ১৭ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৫৬১ টাকা পর্যন্ত বিদ্যুতের বিল বাড়বে। আবাসিক ছাড়া কৃষি, শিল্পসহ সব ধরনের বিদ্যুতের দাম বেড়েছে গড়ে ইউনিটপ্রতি ৩৬ পয়সা। বৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। এ নিয়ে গত ১০ বছরে আটবার খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলো।

নতুন বিদ্যুতের বিল কার্যকর হবে মার্চ থেকে। আর গ্রাহককে দিতে হবে মার্চ মাসের বিল এপ্রিল মাসে। তবে যেসব গ্রাহকের প্রিপেইড মিটার রয়েছে, তাদের মার্চ মাস থেকে বিদ্যুতের বিল নতুন দামে দিতে হবে। এর আগে সবশেষ ২০১৭ সালের নভেম্বরে পাইকারি বিদ্যুতের দাম গড়ে ৩৫ পয়সা বা ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়িয়েছিল সরকার, যা ওই বছর ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। এ নিয়ে গত ১০ বছরে ৮ বার খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ল।

বিদ্যুতের এই দাম বাড়ার প্রভাব কেবল বাসাবাড়িতে পড়বে তা নয়, কৃষি ও শিল্পপণ্যের উৎপাদন খরচও এতে বৃদ্ধি পাবে। উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরাও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তে হতাশার কথা জানিয়েছেন। এমনিতে সামগ্রিক অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে। বেশির ভাগ সূচকই নিম্নগামী। বিশ্ব অর্থনীতিও মন্দার আশঙ্কায়। কমে যাচ্ছে সামগ্রিক চাহিদা। এ রকম এক সময়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কতটা সময়োপযোগী, এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন উদ্যোক্তারা।

এদিকে ঢাকা ওয়াসার বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রতি এক হাজার লিটার পানির অভিকর আবাসিকে ১১.৫৭ টাকার স্থলে ১৪.৪৬ টাকা এবং বাণিজ্যিকে ৩৭.০৪ টাকার স্থলে ৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পানির বাড়তি দাম আগামী ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে।

বিইআরসির যুক্তি

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিইআরসির কার্যালয়ে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান মো. আবদুল জলিল। গত বছরের ডিসেম্বরে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি শেষ হয়। আইন অনুযায়ী গণশুনানির ৯০ দিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত জানাতে হয় বিইআরসিকে। বিইআরসির দাবি, দাম বাড়ানোর পরও সরকারকে ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।

খুচরা বিদ্যুতের দাম বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে পাইকারি বিদ্যুৎ ও বিদ্যুতের সঞ্চালন মাশুল। পাইকারিতে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট গড়ে ৪০ পয়সা বা ৮ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। এর আগে পাইকারি বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট বিক্রি হতো ৪ টাকা ৭৭ পয়সায়। মার্চ থেকে এর দাম হবে ৫ টাকা ১৭ পয়সা। এ ছাড়া বিদ্যুৎ সঞ্চালন মূল্যহার বা হুইলিং চার্জ প্রতি ইউনিটে শূন্য দশমিক ২৭৮৭ টাকা থেকে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়িয়ে করা হয়েছে শূন্য দশমিক ২৯৩৪ টাকা।

বিদ্যুতের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে বিইআরসির চেয়ারম্যান মো. আবদুল জলিল সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, আমদানি করা কয়লার ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট, প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের ওপর ১০ পয়সা ডিমান্ড চার্জ আরোপ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্র ভাড়ার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, পল্লী বিদ্যুতে তুলনামূলক কম দামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। ঋণের অর্থায়নে বিদ্যুৎ খাতে বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়ায় সেখানে সুদ দিতে হচ্ছে। এসবই এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ার কারণ।

তবে এ যুক্তির সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কোনো দরকার ছিল না। এমনকি গণশুনানিতে দাম বাড়ানোর পক্ষে কোনো যুক্ত দেখাতে পারেনি প্রস্তাব নিয়ে আসা বিতরণ কোম্পানিগুলো।

এম শামসুল আলম আরও বলেন, ক্যাবের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে একটি হিসাব দেওয়া হয়েছিল। যেমন পাইকারি বিদ্যুতে পিডিবি মুনাফা করছে ৫০০ কোটি টাকা, কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাদের মুনাফা করার সুযোগ নেই। এ রকমভাবে সুনির্দিষ্ট খাত উল্লেখ করে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার অযৌক্তিক ব্যয় দেখানো হয়েছিল। সুনির্দিষ্ট এসব অযৌক্তিক ব্যয় কমানো গেলে দাম বাড়ানোর দরকার হতো না।

অযৌক্তিক ব্যয় আমলে না নেওয়ার কারণ হিসেবে শামসুল আলম বলেন, মূলত বিদ্যুৎ খাতে যে লুটপাট চলছে, তা অব্যাহত রাখতে অযৌক্তিক ব্যয় থেকে সরে আসার চেষ্টা করেনি বিইআরসি।

ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন

বিদ্যুতের দাম বাড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলছেন, ইতিমধ্যে পোশাকশিল্প খাত ক্ষতির মধ্যে পড়েছে। দেশের শীর্ষ পণ্য রপ্তানির পোশাকশিল্প কোনো সময়ের চেয়ে চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে ১ হাজার ৯০৬ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করা হয়েছে। এই আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৫ দশমিক ৭১ শতাংশ কম। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ায় খাতটি আরও নাজুক পরিস্থিতিতে পড়বে।

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে, জানতে চাইলে পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি রুবানা হক গতকাল মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘চার বছরে গ্যাস-বিদ্যুৎসহ নানা কারণে আমাদের খরচ বেড়েছে ২৯ দশমিক ৪০ শতাংশ। তার বিপরীতে বিদেশি ক্রেতারা পোশাকের দাম কমিয়েই যাচ্ছেন। সব মিলিয়ে পোশাক কারখানাগুলোর পক্ষে বিদ্যুতের বাড়তি ব্যয় নেওয়ার সক্ষমতা নেই।’

বস্ত্রকলশিল্পের ব্যবসায়ীরাও বিদ্যুতের দাম বাড়ার ঘোষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বস্ত্রকলমালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সভাপতি মোহাম্মদ আলী গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, এর ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উইভিং মিল এবং বড় স্পিনিং মিল বিপর্যস্ত হবে। এ শিল্পে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা অনুসন্ধান না করেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক ও কর বাড়ানোর কারণে ইস্পাত খাত বড় ধরনের ঝাঁকুনি খায়। তখন রডের দাম বাড়ে। কোম্পানিগুলোর বিক্রিতে ধস নামে। নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ার কারণে রডের উৎপাদন খরচ বাড়বে। তাতে রডের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ মাসাদুল আলম বলেন, দেশের অর্থনীতি একটি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়া শিল্পকারখানার জন্য খুবই উদ্বেগের খবর।

বিভিন্ন সংগঠনের ক্ষোভ

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোয় উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতিতে বলেছেন, বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধিতে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানান।

বিদ্যুতের দাম বাড়ার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে সিপিবি, বাসদ, গণসংহতি আন্দোলনসহ আটটি বাম দলের সমন্বয়ে গঠিত বাম গণতান্ত্রিক জোট। জোটটি বলেছে, সরকারের ভুল নীতি, দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে বারবার বিদ্যুতের বাড়াতে হচ্ছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কারণে বাড়িভাড়া, গাড়িভাড়া সহ জিনিসপত্রের দাম বাড়বে।

বাংলাদেশ ন্যাপ, খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন সংগঠন বিদ্যুতের দাম বাড়ার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।