১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১২ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

১১শ’ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়ম


ফটোনিউজবিডি ডেস্ক: | PhotoNewsBD

২৭ জানুয়ারি, ২০২০, ৬:৪১ অপরাহ্ণ

পণ্য ক্রয়ে দরপত্রের শর্তের কারণে ৩৩৭ কোটি টাকা গচ্চার বিষয়ে ডিপিডিসির ব্যাখ্যা নিয়ে তদন্ত করতে পারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। এর আগে ডিপিডিসির কাছে এ গচ্চার বিষয়ে জানতে চায় মন্ত্রণালয়। এতে ডিপিডিসিজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। ১৬ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী প্রধান সাইয়েদা ফয়জুন্নেছা স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। এতে ১৬ জানুয়ারি দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত খবরের বিষয়ে ডিপিডিসিকে ২ কর্মদিবসের মধ্যে যৌক্তিক ব্যাখ্যা বিদ্যুৎ বিভাগে পাঠানোর জন্য বলা হয়।

জানা গেছে, ডিপিডিসি তড়িঘড়ি করে ১৯ জানুয়ারি ব্যাখ্যাসহ মন্ত্রণালয়কে চিঠির জবাব দিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, ডিপিডিসির ব্যাখ্যায় তারা সন্তুষ্ট নন। কারণ ডিপিপি বানানোর দায়িত্ব ডিপিডিসির। দরপত্রে উল্লেখিত অধিকাংশ মালামাল দেশে উৎপাদিত হয়। মূল্যের দিক থেকে বিবেচনা করলেও প্রায় ২২ শতাংশ কম দামে দেশে পাওয়া যাবে। শুধু ১১ কেভি লাইনই নয়, বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো বর্তমানে বিদেশি কোম্পানির পক্ষে বিভিন্ন প্রকল্পে ১৩২ কেভি বৈদ্যুতিক লাইনও নির্মাণ করছে। কাজেই এসব দিক বিবেচনা করেই ডিপিডিসির দরপত্র তৈরি করা উচিত ছিল। স্থানীয়ভাবে দরপত্র আহবান করলে এই ৩৩৭ কোটি টাকা গচ্চা যেত না। এ অবস্থায় মন্ত্রণালয় ডিপিডিসির ব্যাখ্যা নিয়ে তদন্ত করতে পারে বলেও তিনি জানান।

এদিকে প্রায় ১১শ’ কোটি টাকার এই প্রকল্পের অনিয়ম-দুর্নীতি ও দরপত্রের রহস্যজনক শর্তগুলোর কারণ উল্লেখ করে অনুসন্ধানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অভিযোগ দায়ের করেছে দরপত্রে অংশগ্রহণকারী দুটি কোম্পানি। ১৯ জানুয়ারি এই অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও এই অভিযোগ তদন্তের জন্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেয়া হতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে মন্ত্রণালয়কে দেয়া ডিপিডিসির ব্যাখ্যায় দুটি অংশ ছিল। প্রথম অংশে ছিল যুগান্তরে প্রকাশিত রিপোর্ট, দ্বিতীয় অংশে ছিল ওই রিপোর্টের ব্যাখ্যা। রিপোর্টে প্রকাশিত মোট ৫টি অংশের ব্যাখ্যা দিয়েছে ডিপিডিসি। তবে এই ব্যাখ্যা নিয়ে খোদ ডিপিডিসির একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তাও সন্তুষ্ট হতে পারেননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শীর্ষ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ব্যাখ্যার অনেক জায়গায় গোঁজামিল দিয়ে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি ধারণা করছেন, এ ঘটনা নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করলে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসবে। এটি প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প।

যুগান্তরের রিপোর্টে বলা হয়েছিল, আমদানিকৃত পণ্যের জন্য ডিপিডিসিকে শুল্ক দিতে হবে। সেজন্য এ পরিমাণ টাকা গচ্চা যাবে। এ প্রসঙ্গে ডিপিডিসি তাদের ব্যাখ্যায় গচ্চা যাওয়ার কথা স্বীকার করে নিয়ে বলেছে, বর্ণিত প্রকল্পটির ডিপিপি একনেকে অনুমোদিত। টার্ন-কি পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক দরপত্রে শুল্ক ও ভ্যাট দরপত্র আহবানকারী প্রতিষ্ঠানকেই পরিশোধ করতে হওয়ায় এই টাকা গচ্চা যাবে।

বিদেশ থেকে ট্রান্সফরমার, ক্যাবল, বৈদ্যুতিক খুঁটি, হার্ডওয়্যার, ইনসুলেটর, ফিউজ কাটআউট, লাইটিং এরেস্টার, সিভিল ওয়ার্কসহ প্রায় ১১শ’ কোটি (১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) টাকার প্রকল্প এটি। কোম্পানির ১১ কেভি নতুন ডিস্ট্রিবিউশন লাইনসহ ভূগর্ভস্থ ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম এবং চলমান ১১ কেভি ডিস্ট্রিবিউশন লাইন নবায়নের জন্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জামগুলো কেনার কথা। স্থানীয়ভাবে প্রস্তুতকৃত একই মানের পণ্য না কিনে আমদানি করার খেসারত হিসেবে এই গচ্চা দিতে হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ডিপিডিসি তাদের ব্যাখ্যায় বলেছে, প্রকল্পের গুরুত্ব বিবেচনা এবং গুণগত মান বজায় রাখতে ডিপিপিতে কাজ বাস্তবায়নের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবান অনুমোদিত হয়েছে। দরদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বৈদ্যুতিক খুঁটি, ট্রান্সফরমার, হার্ডওয়্যার, পোল ফিটিংস, সিভিল ওয়ার্কস বাংলাদেশ থেকে কেনার প্রস্তাব করেছে। এ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা বলেন, যদি এসব মালামাল দেশীয় কোম্পানির কাছ থেকে ক্রয় করার কথা দরপত্রে উল্লেখ করা হয় তাহলে ৩৩৭ কোটি টাকা গচ্চা দিয়ে আন্তর্জাতিক দরপত্রের কি দরকার ছিল? তিনি বলেন, একদিকে দেশীয় কোম্পানিগুলোকে সুযোগ দেয়ার কথা ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, অপরদিকে ইচ্ছাকৃতভাবে দরপত্রে কিছু কঠিন শর্ত দেয়া হয়েছে, যাতে শর্তগুলো দেশীয় কোম্পানিগুলো পূরণ করতে না পারে। দরপত্রে দেশীয় শিল্প বিকাশে ১৫ শতাংশ ডমোস্টিক প্রাইজ প্রিফারেন্সের কথা বলা হলেও বাস্তবে দেশীয় কোম্পানিগুলোকে ৫৮ শতাংশ ট্যাক্স ও ভ্যাট দিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। দেশীয় ট্রান্সফরমার কোম্পানিগুলোর দরপত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ দিলেও বলা হয়েছে, একক কার্যাদেশের মাধ্যমে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের ৬৩৮টি ট্রান্সফরমার সরবরাহের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। যা কোনোভাবেই দেশীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। ডিপিডিসি এটা জেনেও এ ধরনের শর্ত দিয়ে পছন্দের কোম্পানিগুলোকে সুযোগ করে দিতে এ দরপত্র আহবান করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

কারিগরি মূল্যায়নে ৪টি কোম্পানিকে রেসপন্সিভ করা হয়। সর্বনিম্ন দরদাতার কারিগরি প্রস্তাব কেবল জয়েন্টিং, মালামাল, রিংমেইন ইউনিট, এমসিসিবি, টেস্ট ইকুইপমেন্ট ডিপিডিসির চাহিদা অনুযায়ী ছিল না। সে কারণে প্রথম দফায় তাকে বাদ দিয়ে পরে আবারও রেসপন্সিভ করা প্রসঙ্গে ডিপিডিসি তাদের ব্যাখ্যায় বলেছে, দরপত্র মূল্যায়নে ৩ জন দরদাতা কারিগরিভাবে রেসপন্সিভ হয়। কিন্তু কোম্পানির ২৭০তম বোর্ড সভায় প্রকিউরমেন্ট রিভিউ সংক্রান্ত বোর্ড সাবকমিটির সুপারিশে সর্বনিম্ন দরদাতা কোম্পানিকে রেসপন্সিভ করা হয়। এ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে মন্ত্রষালয়ের ওই কর্মকর্তা বলেন, এই বিষয়টি তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তদন্ত করলেই কিভাবে সর্বনিম্ন দরদাতা রেসপন্সিভ হয়েছে তা বেরিয়ে আসবে। কারণ দরপত্রে উল্লেখ নেই এমন দেশ থেকে কোনো মালামাল ক্রয় করার সুযোগ নেই। যদি এই অভিযোগটি প্রমাণিত হয় তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। ডিপিডিসি জানায়, সর্বনিম্ন দরদাতা কোম্পানি ৯১৯ কোটি টাকা দর প্রস্তাব করেছে। যা প্রকল্পের প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ৮.১১ শতাংশ কম। দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতার দর ১১১৪ কোটি টাকা। যা প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ১১.৪১ শতাংশ বেশি এবং সর্বনিম্ন দরদাতার চেয়ে ১৯৫ কোটি টাকা বেশি। দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা দেশীয় প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও দেশে প্রস্তুত হয় এ রূপ মালামাল ট্রান্সফরমার, পোল ফিটিংস এবং কন্ডাক্টর জয়েন্টিং ম্যাটেরিয়ালস বিদেশ থেকে সরবরাহের প্রস্তাব করেছে। এ প্রসঙ্গে খোদ ডিপিডিসিরই একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, দেশীয় দুই প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে মালামাল দেয়ার প্রস্তাবটি দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী বৈধ ছিল। কিন্তু সর্বনিম্ন দরদাতা দরপত্রের শর্তের বাইরে গিয়ে দেশীয় টান্সফরমার প্রস্তাব করে দরপত্রের অর্থনৈতিক মূল্যায়নে ১৫ শতাংশ প্রিফারেন্সের সুযোগটি কিভাবে নিল সেটা ব্যাখ্যা করেনি ডিপিডিসি। ট্রান্সফরমারের লস ক্যাপিটালাইজেশন এবং ডমস্টিক প্রিফারেন্স বিবেচনায় নিলে সর্বনিম্ন দরদাতার এবং দ্বিতীয় দরদাতার মধ্যে ব্যবধান হয় মাত্র ২৫ কোটি টাকা। আর সর্বনিম্ন দরদাতা বিদেশ থেকে ৬৫৭ কোটি টাকার মালামাল আনার কারণে তাদের অতিরিক্ত ৩৫০ কোটি টাকা দিতে হবে ডিপিডসিকে। যা অর্থনৈতিক দরপত্রে বিবেচনায় নেয়া হয়নি।

সূত্র: যুগান্তর